ফ্রেমবন্দী

‘যখন চিতা সাজাবে, মনে রেখো,
সারা জীবন খেলাচ্ছলে আমি
হেঁটেছি এক নদীর পাড়ে একা –
যে নদী খুব নীরব, দূরগামী। ‘
কি হইছে আপু? কান্না কেন?
:ও, কি সাইন এটা?
:ভুলে।
হাহাহা।
:ভুল ইমুজি চলে গেছে।
হি হি হি।
কেমন আছেন?
: অনেক ভালো। আপনি?
আমিও ভালো।
: আরো ভালো থাকুন।
আপনার সবুজ অরণ্য কেমন চলছে?
: শুধু আমাকে চায় ওরা। আত্মা মিলিয়েছি ওদের সাথে।
আপনার ছবিটা ভালো হয়েছে। সজীব।
কোনটা?
:আপনার ছবি ইমুতে।
বুড়ো হাবড়া।
:মনে হয় আগের।
হিহিহি
প্রাণবন্ত।
আপনারটার চমক আছে।
:আমার ছবি?
হ্যাঁ চমৎকার।
:কোথায়?
আবেগ আছে।
:ছবি দেইনি তো।
হোয়াটসআপে এ।
:ওহ্।
বয়স কমেছে, সুন্দরের মাঝে সুন্দর।
:এই টাইপ আমার পছন্দ না।
তাহলে কেন?
:এমনিই। দিলাম আর কি।
সুন্দর মন কাড়ে।
ধন্যবাদ ভাইয়া।
সাহিত্য মত পথের উপরে।
:ঠিক তাই।
আপনিও তো এ জগতেরই মানুষ।
সৃষ্টিশীলতার ঠিক উল্টোটা হলো স্বার্থান্ধতা। স্বার্থান্ধতা আমাদের উদার হতে বাধা দেয়।
:অবশ্যই।
যুগ যুগ ধরে এটা রচনা করে চলেছে নানামুখী অন্ধকার গহ্বর।
: আর অক্টোপাসের মতো শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে আমাদের সজীব আত্মার।
থাক আপু এসব কথা।
:কেন থাক কেন।
সবাইকে বিশ্বাস হয় না। পরে পাঁচজন খারাপ বলবে।
তবে আপনি অনেক উদার। আপনের মত।
:কেমন আছেন?
এইতো চলে যাচ্ছে।
:আমি আবার মানুষকে ভয় কম পাই।
কিছু কিছুতো মানতে হয় আপু।
:মেনে মেনেই তো আমাদের এই অবস্থা।
তবে সুন্দরকে সুন্দর বলতে ভালো লাগে।
যেমন আপনি, একটা উদাহরণ।
:এখন রাস্তায় মানুষ মরে পড়ে থাকলেও না দেখার ভান করি।
কি যে বলেন।
হাসালেন।
:আমরা এখন বেঁচে থেকেও মৃত।
প্রাণের খোরাক দিলেন। ধন্যবাদ।
:আপনাকেও।
আসলে অক্সিজেনের বড়ো অভাব।
জীবনে অনেক কিছু খুইয়েছিতো। কষ্ট হয়।
:আমি বুঝতে পারি।
‘জানি আপনি বোঝেন।
চোখে তাকালে বোঝা যায়।
:আপনি বলেই পারছেন সইতে।
তাই নাকি?
কেমন যেন মায়া।
অনুভূতিশীল মন অনেক কিছু পড়ে ফেলে।
: হাহাহা।
কটায় ঘুমান?
:আপনার রঙতুলিও কিন্তু অনেক কথা বলে।
ছুঁয়েছে?
:হুম।
সুন্দর সবচেয়ে সুন্দরী মানেন?
:তাই নাকি? কি রকম?
ময়ূরের পাখার মতো, মাঝ বয়েসী মেয়ের কোমল ঠোঁটের মতো।
একদিন চা খাবেন আমার সাথে?
:হ্যাঁ!
‘যখন চিতা জ্বালাবে, যেন শিখা
বিনষ্ট এক প্রেমের মতো জ্বলে –
সারা জীবন যে দাহ ছিল বুকে,
সে যেন কাঁপে বাতাসে, তৃণতলে!’
রূপা, তুমি হযতো ভুলে গেছো আজ আমার জন্মদিন। কেমন আছো তুমি? আজ খুব মনে পড়ছে সেদিনের কথা যেদিন প্রথম আমরা একসাথে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। একুশ বছর আগের কথা, তাই না? ভর দুপুরে তুমি কলেজ ফাঁকি দিয়ে চলে এলে আমার সাথে দেখা করতে। কাঁধের দু’পাশে দুই বেণী তোমার দুলছে। চুলের ফিতা থেকে শুরু করে গায়ের কামিজ জুতো মোজা সমস্ত কিছু সাদায় কী নিষ্পাপ দেখাচ্ছিল তোমাকে! আমরা প্রথমে কড়ইতলায় গিয়ে ঝালমুড়ি খেলাম। তারপর একটা রিকশা নিয়ে একেবারে ইসলামপুরের ঘুপচি গলি দিয়ে সোয়ারী ঘাট। তোমার মধ্যে কেমন একটা ভয় আর অস্বস্তি। আমার মধ্যেও। আমি বললাম, ‘নৌকায় চড়বে’। তুমি চুপ করে রইলে।
– ঝিরঝিরে হওয়া বইছে। বুড়িগঙ্গার বুকে আমাদের ছোট্ট নৌকায় আমরা মোটে তিনটি প্রাণী। তুমি আমি ও মাঝি। আমরা ছাড়া সেদিন আর কেঊই ছিলোনা বুঝি এ বিশ্ব চরাচরে। আমি বললাম, ‘আমি সাঁতার পারি না।’ তুমি মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে বললে, আম্মা চারটার সময় কলেজ গেটে আসবে।’
তোমার ছোট্ট নরম হাতটা আমি তখন আমার হাতে তুলে নিয়েছিলাম। আলতো করে চাপ দিয়ে বলেছিলাম, ‘বলে দিও, আনিস ভাইদের বাসায় গিয়েছিলাম, পারবানা?’ তুমি সেদিন, সেই প্রথমবারের মতো তোমার আশ্চর্য জাদুকরী চোখ দুটি তুলে অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলে। কতক্ষণ, কত প্রহর মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে এরপর খুব দ্রুত কেটে গেছে আমাদের অনেকগুলো বছর, একসঙ্গে, নিঃশ্বাসের কাছাকাছি। কখনো নিঃস্তব্ধ তপ্ত দুপুরে, কখনোবা দিগন্ত প্লাবিত জোৎস্নায়। আবার কখনো বেইলী রোডে, নাটকপাড়ায়। জ্যোৎস্না আমাদের ঢেকে দিয়েছে। মনে আছে একবার তুমি মহুয়া ফুল দেখতে চাইলে। তোমাকে মহুয়া গাছ চেনাবো বলে আমরা রাজধানী ছেড়ে বাসে করে চলে গেলাম অনেক দূরে। টাঙ্গাইলের এক অখ্যাত গ্রামে। কী অসাধারণ কেটেছিল আমাদের সেই দিনটা, না! গ্রামের রাস্তায় কখনো রিকশায়, কখনো হেঁটে হেঁটে মহুয়া গাছ খুঁজে বেড়ানো।
গ্রামের হোটেলে হাঁসের মাংস আর ঝাল ঝাল ছোট মাছের চর্চড়ি দিয়ে ঠোঁট লাল করে ভাত খাওয়া, ইস! তারপর বাসায় এসে একেবারে সাঈদার মুখোমুখি। জিজ্ঞেস করলো, ‘কি ব্যাপার এত রাত হলো যে!’ বলতে যাচ্ছিলাম ‘হান্নানের দোকানে গিয়েছিলাম।’ সেদিন বাক্যটা শেষ করতে পারিনি। ড্রইংরুম এর সোফায় ফিরনির বাটি হাতে জলজ্যান্ত বসে আছে আমার বন্ধু হান্নান।
‘যখন চিতা নিবিয়ে দেবে -দেখো,
নিবিড় করে রাখি নি কিছু ধরে :
মুঠিতে ছিল শিশির, পাতা, পাখি –
সকল গেল অন্ধকারে ঝরে! ‘
রূপা, তুমি এখন কত বড়ো হয়েছো? কত হবে তোমার বয়স এখন, সাঁইত্রিশ? আটত্রিশ? দু’ কপালের দু’পাশে দু’একটা চুলে হয়তোবা পাক ধরেছে তোমার তাই না? কিন্তু তা কি তোমার সৌন্দর্যের প্রখরতা মলিন করতে পেরেছে? হযতো বা না। শেক্সপীয়ার ঠিকই বলেছিলেন, “Shall I compare thee to a summer’s day?/ Thou art more lovely and more temparate”। খুব মনে আছে তুমি আয়না দেখতে ভালবাসতো। আমি যখন তোমাকে পড়াতাম, তখনও তুমি ব্যাগ থেকে তোমার কাঠের ছোট আয়নাটা বের করে বারবার সাজগোজ ঠিকঠাক করতো। একদিন ঘুরতে গিয়ে তুমি আয়না আনতে ভুলে গেছো। মুখ দেখতে না পেরে তোমার সেকি অস্বস্তি! সেদিন আমি তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম শান বাঁধানো দীঘির ধারে….। রূপা, মিনি কেমন আছে? তোমাদের গেটের পাশের হাসনাহেনা গাছ দুটো কি এখনো আছে? এখনো কি অঝোর বৃষ্টিতে তুমি ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজো? রাতের অন্ধকারে একলা আকাশ দেখো?
তুমি একটা আস্ত বোয়াল মাছ রান্না করেছিলে আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে। গন্ধে ক্ষুধা লেগে যায়। আমার প্রতি জন্মদিনে তুমি নিজের হাতে কেক বানাতে আর বোয়াল মাছ রান্না করতে। সাঈদা কোরান খতম দিয়ে উঠলো? বড়ো ভালো মেয়ে। আমার জন্য কত কষ্টই না করলো জীবনে। দেখে মায়া লাগে।
রূপা তুমি না তারা ভালোবাসো? আকাশে দক্ষিণ কোণে দেখো একটা তারা। হালকা নীল , জ্বলজ্বল করছে। এখানে অনেক শীত। কী করি বলতো? রূপা, অনেক আগে একদিন তোমাকে একটা প্রমিজ করিয়েছিলেন , মনে আছে? বলেছিলাম যে কথা দাও কোনোদিন, কোনো পরিস্থিতিতে তুমি আমার জন্য কাঁদবে না। এমনকি আমি যদি তোমার জীবন থেকে হারিয়েও যাই তাহলেও না। কোত্থেকে যেনো মহুয়া ফুলের তীব্র গন্ধ আসছে, আহ্। রূপা, তুমি তোমার কথা রেখেছো। তোমাকে ধন্যবাদ।


