বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
স্পটলাইট

অপ্রাপ্ত বয়সে ৬৬% পোশাক শ্রমিকের বিয়ে, ৪ জনে একজনের গর্ভপাত

garm

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। কিন্তু গার্মেন্টসে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে বাল্যবিয়ে ও কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের প্রবণতা উদ্বেগজনক আকারে বেড়েছে।

সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআরবি মিলনায়তনে ‘তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (৬৬ শতাংশ) নারী শ্রমিকদের এবং অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়সে প্রথমবারের মতো গর্ভধারণ করেছেন। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের হার তাঁদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। 

এছাড়াও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং প্রতি চারজনের একজন গর্ভপাত বা মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন করেছেন।

গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায় আইসিডিডিআরবি প্রায় ২৪ মাসব্যাপী এই গবেষণা পরিচালনা করে। এটি প্রথম বাংলাদেশে পরিচালিত এমন কোনো গবেষণা। গবেষণাটি কড়াইল ও মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে আইসিডিডিআরবির আর্বান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইলেন্সের আওতাধীন এলাকায় পরিচালিত হয়। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ গবেষণাটি করা হয়। এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৫-২৭ বছর বয়সী মোট ৭৭৮ জন বিবাহিত নারী গার্মেন্টস শ্রমিককে এবং প্রতি ছয় মাস পর পর তাঁদের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।

সচেতনতা ও পরিবার পরিকল্পনা

সেমিনারে গবেষণার ফলাফলে তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, গার্মেন্টস কর্মীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, যা দুই বছর শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। মাত্র ১৫ শতাংশ নারীর জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল এবং গবেষণা শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশে। একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনায় লিঙ্গ সমতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশে পৌঁছেছে।

Advertisements

ঘর ও কর্মস্থল দুই জায়গাতেই নারী শ্রমিকরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গবেষণায় দেখা যায়, যৌন সহিংসতা ছাড়া অন্য সব ধরনের সহিংসতা গত দুই বছরে বেড়েছে। গত ১২ মাসে স্বামীর সহিংসতার হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণার শুরুতে যেখানে প্রায় ৪৮ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, গবেষণার শেষ দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশে অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রেও সহিংসতার প্রবণতা উল্টোদিকে গেছে।

তবে খুব কম সংখ্যক নারী সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য চাইছেন। গবেষণার শুরুতে যেখানে ৩৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে (পরিবার বা বন্ধুদের কাছে) সাহায্য চাইতেন, গবেষণার শেষ দিকে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২১ শতাংশে। মাত্র এক-পঞ্চমাংশ নারী কর্মক্ষেত্রের সহিংসতার ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন এবং দুই বছর পরেও এ হার অপরিবর্তিত রয়েছে।

তরুণ বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমাতে নিয়ামক

গবেষণায় তরুণ বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমাতে কিছু নিয়ামকও চিহ্নিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কম তাদের যারা সন্তান ধারণের আগেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করেছিলেন। আর যারা প্রথম গর্ভধারণের আগে গার্মেন্টস খাতে কাজ শুরু করেছিলেন তাঁদের ঝুঁকি আরও কম। অন্যদিকে গবেষণায় উঠে এসেছে, স্বামী কর্তৃক সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকলে কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়।

গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বামীর সহিংসতাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন মাত্রা। যেমন মানসিক ও যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকে। মতামত প্রকাশের ক্ষমতা থাকলে যৌন সহিংসতা কমে। আবার শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকিও কমে যায় যদি চলাচলে স্বাধীনতা থাকে।

বিভিন্ন আলোচকের মতামত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (পরিকল্পনা ও গবেষণা) সহকারী পরিচালক ডা. সেকেন্দার আলী মোল্লা, পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক ডা. উবাইদুর রব, বিকেএমইএর যুগ্ম সচিব ফারজানা শারমিন এবং মেরী স্টোপস বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও স্বতন্ত্র গবেষক ইয়াসমিন এইচ আহমেদ- ঢাকার মহাখালীতে আইসিডিডিআরবি ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক ছিলেন আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ। তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেলে শুধু পরিবারে নয়, কর্মক্ষেত্রেও সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত হতে পারেন। গার্মেন্ট শ্রমিক নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বিকেএমইএর যুগ্ম সচিব ফারজানা শারমিন বলেন, গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শমূলক সেবা বৃদ্ধির কাজ চলছে। তবে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

Advertisements