খেশ শাড়ি কি এভাবেই হারিয়ে যাবে?

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির নাম আমরা অনেকেই জানি। তবে এখানেই তৈরি হয় আরও একটি অনন্য শাড়ি। এই ধরনের শাড়ি অনেকেই হয়তো চোখে দেখেছেন, পরেছেনও। কিন্তু নাম জানেন না। এই শাড়ির নাম খেশ শাড়ি। পুরোনো কাপড় পুনর্ব্যবহার করে তৈরি হয় এই বিশেষ ধরনের শাড়ি। এটি একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে তেমনি আমাদের ঐতিহ্য আর দক্ষতার প্রতিচ্ছবি।
খেশ শাড়ির শুরুটা হয় কলকাতায় ১৯২০ সালের দিকে। তখনকার তাঁতিরা পুরোনো শাড়ি আর ধুতি কেটে নতুন করে শাড়ি বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই ধারনাই পরে রূপ নেয় খেশ শাড়িতে। শান্তিনিকেতনের শিল্পসদনে এই পদ্ধতির প্রথম প্রয়োগ হয়। এখানে পুরোনো কাপড়কে নতুন করে গেঁথে তৈরি হয় একেকটি শাড়ি। এমনকি জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্যও তৈরি করা হয়েছিল একটি খেশ শাড়ি।

বাংলাদেশে বর্তমানে এই শাড়ি তৈরি হচ্ছে সীমিত পরিসরে। টাঙ্গাইলের কয়েকজন অভিজ্ঞ তাঁতি এখনো এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে খেশ শাড়ি তৈরি সহজ নয়। এটি সাধারণ তাঁতে তৈরি হয় না। এটি তৈরি করতে প্রয়োজন হয় চিত্তরঞ্জন তাঁত নামের বিশেষ এক ধরনের তাঁতের। এই তাঁতের এখন সংকট চলছে। ফলে অভিজ্ঞ তাঁতিদের অনেকেই পেশা বদলে ফেলেছেন।
বিনিয়োগকারীরাও চিত্তরঞ্জন তাঁতের চেয়ে পাওয়ারলুমে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে এখনো কিছু মানুষ আছেন যারা এই শাড়িকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যেমন সুলতানা জান্নাত, পূর্ণতা শিল্পশালার স্বত্বাধিকারী। তিনি ছয়জন অভিজ্ঞ তাঁতিকে নিয়ে খেশ শাড়ি তৈরি করছেন যাঁদের পরিবার অনেক প্রজন্ম ধরে এই কাজে যুক্ত। একইভাবে মানস সাহা নামের আরেক ব্যবসায়ীও এই শাড়ির প্রচারে কাজ করছেন। তিনি নিজের তৈরি শাড়িতে খাদি, সুতি ও মিশ্র সুতা ব্যবহার করেন।
খেশ শাড়ি তৈরি করতে লাগে ধৈর্য আর সময়। পুরোনো শাড়িগুলোকে প্রথমে কয়েকবার ধুয়ে চিকন দড়ির মতো কেটে খেশ বানানো হয়। এরপর সেই খেশ আর নতুন সুতি সুতাকে একত্রে বুনে তৈরি হয় সম্পূর্ণ নতুন একটি শাড়ি। এই প্রক্রিয়ায় খেশ বানাতে সময় লাগে ৪–৫ দিন, আর পুরো শাড়ি বুনতে লাগে আরও ২–৩ দিন। মজার ব্যাপার হলো খেশ শাড়িতে ব্যবহার করা সুতা ৬০ কাউন্টের এবং এতে কোনো মাড় দেওয়া হয় না। ফলে শাড়িগুলো থাকে খুবই নরম, তুলতুলে এবং আরামদায়ক।
খেশ শাড়ির আরেকটি দারুণ দিক হলো, এটি পরে সেফটিপিন ছাড়াও সহজে সামলানো যায়। চেহারায় একরকম মাটির গন্ধ ও কারিগরির ছাপ পাওয়া যায়। খেশ শাড়িতে ব্লকপ্রিন্ট, টাই-ডাই বা সূচিশিল্প খুব ভালোভাবে ফুটে ওঠে। কেউ কেউ আবার এতে উন্নত মানের সিল্ক বা খাদির মিশ্রণও করেন। ব্লাউজ হিসেবে গ্রামের চেক প্রিন্ট, টাই-ডাই, খাদি বা সুতির নকশা করা কাপড় বেশ মানিয়ে যায় এই শাড়ির সঙ্গে।

যত্নের দিক থেকেও খেশ শাড়ি বেশ সুবিধাজনক। আলাদা করে কোনো বাড়তি যত্নের দরকার হয় না। সাধারণ ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুলেই চলে। তবে মাঝে মাঝে হালকা মাড় দিলে আর রোদে শুকালে শাড়িটি অনেক দিন ভালো থাকে।
খেশ শাড়ি কেবল একটি পোশাক নয় এটি আমাদের পুনর্ব্যবহারের শিল্প, টেকসই ফ্যাশন আর শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার এক অসাধারণ উদাহরণ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই মূল্যবান ঐতিহ্য কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে?
প্রযুক্তির দাপটে, নতুন ধরনের ফ্যাশনের ভিড়ে এবং তাঁতিদের পেশা পরিবর্তনের কারণে খেশ শাড়ি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। অথচ এই শাড়ির মধ্যে আছে পরিবেশবান্ধব চর্চা, স্থানীয় শিল্পের গৌরব এবং নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয়। তাই সময় এসেছে খেশ শাড়ির প্রতি নতুন করে আগ্রহী হওয়ার, এ শাড়ির গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার এবং কারিগরদের পাশে দাঁড়ানোর। না হলে একদিন হয়তো সত্যিই হারিয়ে যাবে খেশ শাড়ির মতো একটি অনন্য ঐতিহ্য।



