Skip to content

১১ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ডিভোর্সের দায় নারীর একার নয়

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে দিন দিন ডিভোর্সের হার বাড়ছে। গত এক বছরে ডিভোর্সের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৪ শতাংশ। যা আগের বছর ছিলো ০.৭ শতাংশ। মঙ্গলবার (১৩ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ভবনে বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০২২-এর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবেদনেই এসব তথ্য উঠে এসেছে।

দেশে সংসার ভেঙে যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালে ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে ১টি করে তালাক হয়েছে। বিচ্ছেদ বেড়েছে ঢাকার বাইরেও।

রিপোর্ট অনুযায়ী, বিচ্ছেদের আবেদন নারীরা বেশি করছেন। নির্যাতন-পীড়ন থেকে আত্মমর্যাদাবান নারীরা তালাকে খুঁজছেন মুক্তি। বিচ্ছেদের আবেদনের পর সমঝোতা হয়েছে খুবই কম। ৫ শতাংশের নিচে তা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবাহবিচ্ছেদের এই চিত্র পাওয়া গেছে। বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনায় অধিকাংশই নারীকে দোষারোপ করছেন। কেউ বলছেন নারীর অতিরিক্ত স্বাধীনতার কথা, কেউবা বলছেন নারীর অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কথা। এই বিষয়ে নারীর ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে পুরুষ সমাজকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে ! অধিকাংশের মন্তব্যের জেরে মনেই হচ্ছে নারী যেন সংসার পাতেই সংসারের ভাঙন সৃষ্টি করতে!

ডিভোর্স বাড়ছে। কিন্তু ডিভোর্স কেনো বাড়ছে? এই বিষয় অনুসন্ধান করা হয়েছে কি! আর ডিভোর্স হলেই নারীকে কেনো কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? নারী কী একা সংসার করেন নাকি সেখানে পুরুষেরও উপস্থিতি আছে? তবে সংসার ভাঙা বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পিছনের কারণগুলো কেনো সামনে আসছে না। বরং একবাক্যে নারীকে দোষী সাবস্ত করা হচ্ছে!

হ্যাঁ। আগের তুলনায় নারী এখন স্বাধীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং একইসঙ্গে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। মূলত এটি বিবাহবিচ্ছেদের একটি কারণ হিসেবে ধরা যায়। তবে তা মুখ্য কারণ নয়। মূলত যেই নারীরা ডিভোর্সের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা নিশ্চয় হঠকারি কোনো সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না। এটা আগে সবার স্বীকার করা প্রয়োজন যে, নারী বা পুরুষ কেউই কিন্তু সংসার ভাঙতে চান না। তবে কেন ভাঙছে এটাই প্রশ্ন হওয়া উচিত!

সংসার বা দাম্পত্য সম্পর্কের প্রধান শর্ত ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-সম্মান-মনের মিল আবশ্যক। শুধু অর্থের যোগান দিলেই সংসার টেকে না বা ঠিক থাকে না। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দেখা যায়, নিরানব্বই ভাগ পুরুষই সংসারে অর্থ জোগান দিয়ে ক্ষান্ত থাকেন। স্ত্রী-সন্তানের প্রতি তার যে কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে সেটা তিনি অবলীলায় ভুলে যান। অন্যদিকে এই পরিস্থিতির সঙ্গে দিনে দিনে নারী খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে একসময় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং সম্পর্কচ্ছেদ ঘটে। বিবাহবিচ্ছেদ কোনো একটি কারণে ঘটে না, এটা সবাইকে আগে মাথায় ঢুকাতে হবে। অনেক সমস্যা-সংকটকে যখন আর সমাধানের মতো অপশন না থাকে তখনই কেবল একজন নারী বা পুরুষ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

আগের যুগে এতটা বিবাহবিচ্ছেদ না থাকার কারণ তখন নারী বা পুরুষ উভয়ই লোকলজ্জাকে প্রাধান্য দিতো। অর্থাৎ তারা নিজেদের সমস্যার চেয়ে বাইরের মান-অপমানকে বেশি গায়ে মাখতো। ঘরে শান্তি না থাকলেও মেনে নিয়ে মানিয়ে নিয়ে চলার ব্রত পালন করতো। সবচেয়ে বড় কথা তখনকার মানুষের ধারণা এবং বিশ্বাসই ছিল একবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে আজীবন তাকে ভার বহন করতেই হবে। ফলে তখন এই একটি মানসিকতাই অনেক সমস্যাকে গিলে ফেলতো। স্বামী বা স্ত্রী মনে করতেন সমস্যা বাড়িয়ে লাভ নেই, আজীবন থাকতেই হবে। ফলে যেকোনোভাবে সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। আবার অনেকে একসঙ্গে এক ছাদের তলায় কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু আত্মিক সম্পর্কের ইতি টেনেছেন। বিভিন্ন কারণ কিন্তু আছেই।

তবে বর্তমান সময়ে মানুষের মাঝে এসবের বালাই নেই। তারা নিজেদের জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। মনের অমিল, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সম্মান না থাকলে আত্মমর্যাদা খুইয়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন না। অধিকাংশ যে টিকে থাকার লড়াই করছেন না এটাও বলা ভুল। বলে চলে করেও ফল না পেয়ে সম্পর্কের ইতি টানতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই এক্ষেত্রে নারীকে দোষারোপ করা নিষ্প্রয়োজন। কারণ পুরুষের অত্যাচার সহ্য না করে নারীরা মুক্তি খুঁজছে। সেই মুক্তির পথে আর্থিক স্বচ্ছলতা, স্বাধীনতা বিশেষভাবে সহায়ক। তবে এটা মানতেই হবে, নারীরা এখন নির্যাতনকে ‘না’ বলছেন। তা মানসিক বা শারীরিক হোক।

যৌতুক, বৈবাহিক ধর্ষণ, অসম্মান-অবহেলা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, অন্যত্র প্রেম বহুল সমস্যা থেকে বাঁচতে নারী এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। বিচ্ছেদকে যতই নেতিবাচকভাবে দেখা হোক না কেনো এখানে ইতির কিন্তু উপস্থিতি বিদ্যমান। মূলত মানুষ তার নিজেকে প্রাধান্য দিচ্ছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্যাতনে চুপটি করে বসে না থেকে প্রতিবাদ করছে। তাই বিচ্ছেদ নিয়ে শঙ্কিত হতে হলে আগে মানবিক হৃদ্যতা গড়ে তুলতে হবে। নারীর প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, নারীর কাজকে মূল্যায়ন, পারিবারিক দায়-দায়িত্বের প্রতি পুরুষের সহোযোগিতা করতেই হবে। নারীকে অবলা পশু ভেবে পাশবিক অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যুগ যেমন পাল্টাচ্ছে নারীরাও তাদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করছে। ফলে নারীকে মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে বর্তমান সময়ে বিচ্ছেদ কমিয়ে আনা কষ্টসাধ্য! আর সংসার টিকিয়ে রাখার দায় পুরুষ ও নারীর উভয়েরই। ফলে পাল্লার একদিক ভারী হলে সেটা ছিঁড়ে পড়বেই! তাই এতে শঙ্কিত না হয়ে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে উদ্যোগী হতে হবে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ