Skip to content

১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

৩৫ বছর ধরে নারী দলকে নিয়ে পুঁথি পাঠ করেন মায়ারানী

৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন নারীদের দল নিয়ে পুঁথি পাঠ করা চাট্টিখানি কথা নয়। যেখানে আধুনিকতার জোয়ারে আজকাল পুঁথি সম্পর্কেই অবগত নন কেউ। সেখানে হাল ধরেন মায়া রানীর মতো নারীরা। ৩৫ বছর ধরে নারী দলকে নেতৃত্ব দিয়ে পুঁথি পাঠ করা সেই নারী মায়ারানী দাস। আমাদের সমাজের নারী শক্তির জয়গান শোনান তিনি, সঙ্গে এই উপমহাদেশের সংস্কৃতির চর্চাও জিইয়ে রাখেন৷

আজ ১২ নভেম্বর (শনিবার) বিকালে মায়া রানীর দলকে নিয়ে পুঁথি পাঠের আয়োজন করে ‘নিরিখ।’ ‘নিরিখ’-এর যাত্রা শুরুর বর্ষপূর্তি এই নভেম্বরে। এ উপলক্ষে তার বাৎসরিক সঙ্গ আয়োজন করেন। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহামিলন’। নিরিখের মহামিলনে অংশ নিয়ে পদ্মপুরাণ পুথির অংশবিশেষ পাঠ করেন মায়ারানীর দল।

মায়ারাণী দাসের জন্ম ১০ কার্তিক ১৩৫২ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলার লাঙ্গলবন্দে। মায়া রাণীর বাবা মহানন্দ দাস ছিলেন একজন গৃহী বৈষ্ণব সাধক। মহানন্দ দাস ২৪ বছর মৌনব্রত পালন করেন, লোকে তাকে বোবা সাধু বলে ডাকতেন। তাঁদের পৈত্রিক পেশা ছিলো তাঁতবোনা। আদমজী জুট মিলের উল্টোদিকে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল গড়ে উঠলে, মিলে তাঁতবোনার চাকরি নিয়ে মহানন্দ দাস চলে আসেন লাঙ্গলবন্দ ছেড়ে ঢাকেশ্বরী মিলে। মায়ারানীর কঠোর পরিশ্রমী মা মেঘবালা দাস সংসারের অভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে তিনিও তাঁত শ্রমিক হিসেবে চাকরি নেন মিলে।

চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে মায়ারানীই ছিলেন সবার বড়। তার কোনোদিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। বাবার কাছে হাতেখড়ি, ‘বাল্যশিক্ষা’ থেকে অক্ষরজ্ঞান নিয়েই লক্ষ্মীর পাঁচালী দিয়ে তাঁর পুঁথিপাঠ শুরু খুব ছোটবেলা থেকেই। বাবা পাশে বসে শব্দের উচ্চারণ, সুর ঠিক করে দিতেন। ছোট ভাইকে কোলেকাখে রাখবার জন্য মায়ারানী যেহেতু স্কুলে যেতে পারছিলেন না, বাবা তার জন্য বাসায় একজন শিক্ষক রেখে দেন। যার কাছে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন মায়ারানী। শিক্ষক জয়চন্দ্র বর্মন বছর শেষে বাসায়ই তার পরীক্ষা নিতেন। কিন্তু তার পরপরই তার বিয়ে হয়ে যায় রূপগঞ্জ, ভিংগ্রাব গ্রামের হরিদাস কর্মকারের সঙ্গে মাত্র ১১ বছর বয়সে এবং বিধবা হন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে।

বিয়ের পর তার শিক্ষক রেখে ক্লাসের পড়া বন্ধ হলেও, তিনি মাসে আট আনা চাঁদায় শ্রমিক কলোনীর ক্লাব লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন গল্পের বই এনে পড়তেন। বই পড়ার পাশাপাশি সুঁচি কর্মে ছিলো তার ভীষণ আগ্রহ। সারাদিন ছেলেমেয়ে ঘরসংসার সামলে যতটুকু অবসর পেতেন, হয় বই, নয়তো সুইসুতো নিয়ে বসে পড়তেন নতুন কোনো নকশা তুলতে কাপড়ে, চটে। বহু প্রকারের সেলাই জানতেন তিনি, যার গুণে স্বামীর মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জ শহরে একটি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে মাসে ৩০ কেজি গম আর ১০ কেজি চাউল রোজগার করতে পারতেন আশির দশকে।

ঢাকেশ্বরী মিলের মন্দিরের পুরোহিত প্রতি শ্রাবণ মাসে পদ্মপুরান পাঠ করতেন মহানন্দ দাসের বারান্দায় বসে। কলোনীর আরও অনেকেই চলে আসতেন সেই পাঠ শুনতে। সেই সমাবেশের সর্বকনিষ্ঠজন ছিলেন মায়ারানী। পুরোহিতের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সুর তুলতেন। ছোট মেয়েটার এমন আগ্রহ পুরোহিতের মনোযোগ কেড়েছিল। তাই, তিনি যখন বাংলাদেশ শেষে ভারত চলে যান, যাওয়ার আগে ‘পদ্মপুরান’ গ্রন্থখানা মায়া রাণীর হাতে তুলে দিয়ে যান। বলেন, এখন থেকে তুমি প্রতি শ্রাবণ মাসে মনসামঙ্গল পাঠ করে শোনাবে সবাইকে।

পুরোহিত চলে যাবার পর নিজে একা একা ঘরে পদ্মপুরান পড়লেও জনসম্মুখে পাঠ করার সাহস করেননি। কারণ ইতোমধ্যে তার পিতা মহানন্দ মৌনব্রত গ্রহণ করেছেন। ফলে পদ্মপুরান পাঠে পিতার সহযোগিতা পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের মানসিক প্রশান্তি এবং একজন বয়োজেষ্ঠ অন্ধপ্রতিবেশীর অনুপ্রেরণায় তিনি প্রথমে মহাভারত পাঠ করা শুরু করেন। প্রথম প্রথম মায়ারানী পড়তেন, সেই অন্ধশ্রোতা বসে বসে শুনতেন, পাশে বসে থাকতেন ‘বোবাসাধু’ বলে পরিচিত তার পিতা মহানন্দ। তিনি আকার-ইঙ্গিতে, লিখে মেয়েকে প্রতিক্রিয়া জানাতেন।

ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যয়ে মৃত্যুর আগেই তার স্বামী আর্থিকভাবে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তার ৪ ছেলে ৩ মেয়ের বড় পরিবারে ভীষণ আর্থিক সংকট নেমে আসে। আরেক দিকে মিলের মালিকানা বদলে যায়, বন্ধ হয়ে যায় তাঁতকল। ২০০০ শ্রমিকের প্রায় সবাই কাজ হারিয়ে কলোনি ছাড়তে থাকে। সেই স্রোতে ভেসে মায়ারানীর পরিবার নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে ওঠে।

শহরের ঘুপচি ঘরের ভেতরেই মা মনোসার পূজা চলে, চলে পদ্মপুরান পাঠ। ১৯৮৪ সাল থেকে করোনা মহামারীর আগ পর্যন্ত চলেছে তার বাড়ি বাড়ি ঘুরে পদ্মপুরান পাঠ। প্রথম দিকে নিজের ঘরেই পদ্মপুরান পাঠ করতেন, একে অপরের কাছ থেকে শুনে পাড়াপড়শীরা আসতেন তা শুনতে। তারপর এক একদিন এক একজনের বাড়িতে পদ্মপুরান পাঠ করার জন্য নিমন্ত্রণ পেতে থাকেন মায়ারানী।

কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী তার দলের স্থায়ী সদস্য হয়ে পড়েন। তার নারীদলে কোনো পেশাদার বাদক নেই, নিজেরাই কাশি, করতাল, কৃষ্ণকাঠি বাজিয়ে কীৰ্ত্তন করেন। তার এই দীর্ঘ পথ চলায় অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই, কেউবা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে চলে গেছেন অন্য কোন শহরে। কিন্তু তবু থেমে থাকেনি মায়ারানীর পদ্মপুরান পাঠসংঘ। নতুন নতুন যুক্ত হয়েছেন অনেক নারী।

কিন্তু কোভিড এসে বদলে দিয়েছে অনেক কিছুই। মায়ারানী নিজেও কোভিডে আক্রান্ত হয়ে, ভীষণ লড়াই করে ফিরেছেন। কিন্তু ফেরেনি তার শারীরিক কর্মক্ষমতা। কোভিডের ধাক্কায় তার গানের দলের বয়জ্যেষ্ঠ কেউ কেউ বিদায় নিয়েছেন। তারও বয়স এখন ৭৮। এই ইটপাথরের শহরের এপাড়া-ওপাড়ায় বাড়ি বাড়িতে নিমন্ত্রণ নিয়ে পদ্মপুরান পাঠ তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। মনে প্রবল ইচ্ছা থাকলেও, শরীর- গলা আর তার মনের কথা শুনছে না।

তবু মাঝে মাঝে পাটের চটের ওপর উল সুতার সেলাইয়ে জীবনের নকশা তুলতে বসেন আর ভাবেন কার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন মা মনসার এই পদ্মপুরান গ্রন্থখানা?

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ