Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর কেন নিজের বাড়ি থাকবে না?

দেশ শিক্ষায় এগিয়েছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হয়েছে। এই অগ্রগতির অর্ধেক অংশীদার দেশের নারীরাই। এই নারীরা যেমন গৃহকর্মে সময় দিচ্ছেন, তেমনি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছেন। এর বাইরে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে তারা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তবুও নারী নিজস্ব কোনো ঘর নেই। শৈশব-কৈশোরে বাবার ঘরে, বিয়ের পর স্বামীর ঘরে, বৃদ্ধবয়সে ছেলের ঘরেই তার দিন কাটে। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যুপর্যন্ত নারী অন্যের ঘরেই প্রতিপালিত হয়, জীবনযাপনও করে। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীরা পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করার পরও কেন তাদের কোনো নিজস্ব ঘর নেই, এমন প্রশ্নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত নারী ব্যক্তিত্বরা। এই জন্য তারা পুরুষতন্ত্রকে যেমন দুষছেন, তেমনি দায়ী করছেন সম্পত্তিবণ্টনের নিয়মকেও।   

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শারমিন রেজোয়ানা বলেন, ‘‘নারীর নিজের কোনো বাড়ি কেন নেই, এই প্রসঙ্গে বেশ আগে পড়া একটি কবিতার কথা মনে পড়লো। কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো হলো, ‘ঐ গ্রামে শ্বশুর বাড়ি, এই গ্রামে বাপের বাড়ি, তোমার বাড়ি কই হে নারী, তোমার বাড়ি কই?’ এই যে হাহাকার মেশানো কথা মালা, এর মধ্যে মিশে আছে আবহমান কাল ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ, বঞ্চিত নারীদের দীর্ঘশ্বাস। এই অবস্থা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশেও সামাজিক সংস্কার, আইন, নীতি ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে নারীরা অর্থনৈতিক, শিক্ষগত ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।’’

শারমিন রেজোয়ানা

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘নারীদের নিজস্ব কোনো ঠিকানা যেন নেই, শৈশব কাটে বাবার বাড়িতে, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি এবং বৃদ্ধ বয়সে ছেলের বাড়িতে। মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় আচার আবর্তিত হয় তার দীর্ঘদিনের প্রচলিত জীবনাচারণের মধ্য দিয়ে। এই কারণেই উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দূর্গা পূজোতে আমরা দেখি গৃহহীন দেবী দূর্গা। কৈলাশ পর্বতের স্বামীর আলয় থেকে শারদীয় দিনে তিনি সন্তানসহ বেড়াতে আসনে বাবার বাড়ি, এই পৃথিবীতে। পূজে শেষে আবার ফিরে যান কৈলাসেই। কিন্তু তার নিজের বাড়িটি কোথায়?’

নারীর এই অবস্থানগত বিষয়কে পরনির্ভশীলতার প্রতীকায়ন উল্লেখ করে শারমিন রেজোয়ান বলেন, ‘‘গত শতকের আগ পর্যন্ত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কিংবা আধিকার সচেতনতা-এই বিষয়গুলোতে নারীর তেমন অর্থে অংশ গ্রহণ ছিল না। আশার কথা, নারী সচেতন হচ্ছে, সমঅধিকারের বিষয়ে কথা বলছে। বৈষম্যমূলক অনেক পারিবারিক আইন পরিবর্তনে অনেক দেশেই কাজ হচ্ছে। এভাবেই হয়তো একদিন ‘বাড়িহীন নারীদের’ নিজের ঘর হবে, হোক তা যতই ছোট বাবুই পাখির মতো।’’

শারীরিক শক্তির জোরে নারীর ওপর পুরুষ আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে বলে মনে করেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর দীপ্তি মণ্ডল দিতি। তিনি বলেন, ‘প্রাগৈতিহাসিক কালে নারীকে পুরুষ আটকে রেখেছে শক্তি দিয়ে। মধ্যযুগে আটকে রেখেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে, নারী শিক্ষা যেন তখন পাপের সমান ছিল। বর্তমান যুগে যখন শিক্ষায়, চাকরিতে, কাজে বেরিয়েছে নারী, তখন তাকে আটকে ধরেছে পোশাক, যৌন-নিপীড়ন আর ধর্ষণ দিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো মানুষই নারী বা পুরুষ হয়ে জন্ম নেয় না। সমাজই তাকে শ্রেণিভেদ করে দুর্বল কাতারে ধাক্কা দিয়ে নারী নাম হাতে ধরিয়ে দেয়। তার সঙ্গে দেয় সেই অনুযায়ী লম্বা জামা, শাড়ি, যেন দৌড়ে যেতে না পারে। এজন্য বাণিজ্যিকীকরণ দিলো হাই হিল, দেওয়া হলো হাঁড়ি-পাতিল, রান্নাঘর আর পটল-আলু কাটার জীবন। মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হলো পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য ও তাদের ভালো রাখার জন্য, সব সময় সন্তুষ্টি প্রদানের জন্য নারীর জীবন উৎসর্গ করতে হবে। এটাই নারীর উত্তম কর্ম এবং উত্তম ধর্ম।’

দীপ্তি মণ্ডল দিতি

আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়াও নারীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে উল্লেখ করে দিতি বলেন, ‘নারীকে পণ্যে পরিণত করছে ঠিক শিক্ষা আর জ্ঞানের অভাবে। নারীর শরীর তো বেঁচে থাকার জন্য। তার হাত দুটো কাজের জন্য, পা দুটো চলার জন্য, মুখটা খাবার খাওয়ার জন্য, পেটটা খাবার রাখার জন্য, আমার স্তন দুটো নতুনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এতে যৌনতার কী হলো?

নারী রান্না জানে কি না? তার বেতন কত? সে কী চাকরি করে? তার চাকরির সঙ্গে তাদের জীবন যাপনের সুবিধা হবে কি না? এমন প্রশ্ন পাত্র পক্ষ করে। কিন্তু নারীর বাবা পাত্রকে রান্নার কথা জিজ্ঞেস করে না। এমনকি তার আয়ের হিসাবও জানতে চায় না। তাহলে শিক্ষিত ও চাকরিজীবী হলে নারী ভিন্ন মাত্রায় মার খেয়ে ওঠে।’

পেশাজীবী নারীরা বলছেন, একটা নির্দিষ্ট সময়, বিশেষ করে একজন নারীর বয়স যখন ৩০-এর কাছাকাছি আসে, তখন তার হাই-ম্যাচুরিটি চলে আসে। বিয়ে তখন তার কাছে অনেকটাই রিলাক্স হয়ে যায়। এটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে বিয়ে করতেই হবে। বিয়ের পর বাবার পরিবার শত্রু পক্ষ হয়ে ওঠে। তাকে বাড়িতে জায়গা দেয় না। তাই তাকে চলে যেতে হয় শ্বশুর বাড়ি। মেয়েদের জীবনটা পুতুল পুতুল খেলার মতো নিজস্বতার কোনো মূল্য নেই। মূল্য দিতে চাইলেই তারা হয়ে উঠবে ব্যতিক্রম, কেউ তাদের সহজ দেখবে না। শ্বশুরের বাড়ি, বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি কোথাও নারীর জায়গা নেই।

এই প্রসঙ্গে দিতি বলেন, ‘ঢাকা শহরে অধিকাংশ বাড়ির নাম মহিলাদের নামে। কিন্তু ভোগ দখল ভিন্ন কথা বলে। প্রতিনিয়ত এই সমাজে ব্যবহৃত হওয়া মানুষের নাম ‘নারী’। এ সমাজে নারীর কোনো নিজেস্বতা নেই, নিজেস্ব ঘর সেটা তো শক্ত বিষয়।’

চাকরিজীবী নারীরা বলছেন, দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আসলে নারীর কোনো নিজস্ব বাড়ি নেই। এই কথাটা তিক্ত সত্য ও দৃশ্যমান। এই প্রসঙ্গে ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক (এনএইচএন)-এর যুগ্ম-পরিচালক (প্রশাসন) সায়রা মুন্নী বলেন, ‘‘আমার বাবার উদ্দেশে মাকে প্রায় বলতে শুনতাম, আমাকে একটা মাথা গুঁজবার ঠাঁই করে দিয়ে যাও। শেষ বয়সে ছেলে-মেয়েদের আশ্রয়ে থাকাটা আমার সম্মানে বড্ড লাগে। বাবা উত্তর বলতেন, কেন? আজিমপুরে তো স্থায়ী বাড়ি আছেই। তখন আজিমপুরের বাড়ি বলতে বাবা ঠিক কী বোঝাতেন, সেটা বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি। কয়েকটা পয়েন্ট যদি আমি স্পষ্ট করে বলি, তাহলে ‘নারীর কেন নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই?’ এই প্রশ্নের উত্তর সহজে বেরিয়ে আসবে।’’

সায়রা মুন্নী

কারণ উল্লেখ করে সায়রা মুন্নী বলেন, ‘প্রথমত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিবারের কর্তা পুরুষ, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুরুষরাই। দ্বিতীয়ত, অবিবাহিতকালে নারীরা সন্তান হিসেবে বাবার অধীন এবং বিবাহ পরবর্তীকালে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর অধীন। তৃতীয়ত, পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে সম্পত্তির মালিকানা স্বাভাবিকভাবে পুরুষেরা নিজের নামেই করে থাকে।  যেহেতু মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা অন্যের সংসারে চলে যায়, সেহেতু বৃদ্ধ পিতা-মাতা তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সম্পত্তি পুত্রদের হাতে তুলে দেন। চতুর্থত, উত্তরাধিকার আইনে পিতা-মাতার সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ পুরুষরাই পেয়ে থাকে। পঞ্চমত, নারী উপার্জনক্ষম হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বামী বা বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে নিজে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগের বাংলা বিভাগের প্রভাষক সিনথিয়া মুমু বলেন, ‘পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষকেই মূলত উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত করা হয়। তাই সম্পত্তির মালিকানাও তাদের হস্তগত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। যার ফলে তারাই পরিবারের সর্বময় কর্তার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ কম থাকায়, নারী সম্পত্তির মালিকানা পায় না। জীবনের সিংহভাগ সময় তাদের অতিবাহিত হয় ক্ষমতাহীন এক রাজত্বের বোঝা বইতে বইতে, যেখানে তার জীবনের মূল লক্ষ্য জীবনের পুনরাবৃত্তি ও সংসার-স্বামীর সেবা-যত্ন।’

সিনথিয়া মুমু

সিনথিয়া মুমু আরও বলেন, ‘ছকেবাঁধা জীবনটাই যেন নিয়তি। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় নারী মেনে নিয়েছিল হেঁসেলের দায়িত্বটা। এত কিছুর মাঝে নারী একসময় হারিয়ে ফেলে তার নিজের সত্তা। নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায় কোনো না কোনো পুরুষের অভিভাবকত্বে অতিবাহিত হয়, তখন সেটাই তার আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। তাই তো নারীর নিজের কোনো ঠিকানা নেই।’

নারী মেহমানের মতো সমাজে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ফারজানা ববি। তিনি বলেন, ‘‘নারীর নিজস্ব বাড়ি কোনটা? বহুল চর্চিত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর, ‘নারীর নিজস্ব বাড়ি নেই।’ বিয়ের আগে সে বাবার বাড়ির অতিথি, বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ির। ‘কোথায় যাচ্ছ?’ এই প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে হয়, বাবার বাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ি। নারী কি তবে সংসারে কেবল অতিথি’’

ফারজানা ববি আরও বলেন, ‘নারীর কেন নিজস্ব বাড়ি নেই? মজার বিষয় হচ্ছে, এই প্রশ্নটা অধিকাংশ নারীর মাথাতেই আসে না। কারণ নারীর নিজের বাড়ি থাকতে হবে, এই মানসিকতাই তাদের বেশিরভাগের তৈরি হয়নি। তার নানাবিধ কারণ।’

প্রথমত কারণ হিসেবে ফারজানা ববি বলেন, ‘নারী তথা সন্তানের প্রথম হাতেখড়ি হয় তার পরিবার থেকে। আরও স্পষ্ট করে বললে মায়ের কাছ থেকে। সন্তান ছোটবেলা থেকেই দেখে দেখে শেখে এটা তার মায়ের বাড়ি নয়, বাড়িটা তার বাবার। এমনকি, সন্তান দেখে তার মা নিজের ঠিকানা বলতে গিয়েও বাবার ঠিকানাটাই বলে। নারী যখন তার মায়ের কাছে এসব দেখে বড় হয়, বেড়ে ওঠে, তার কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হয়।’

ফারজানা ববি

দ্বিতীয়ত কারণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী এখনো তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত বলে মন্তব্য করে ফারজানা বলেন, ‘নারীর প্রতি বৈষম্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। নারীকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। নারীর অভিমত পরিবার তথা সমাজের কাছে অবমূল্যায়িত। ফলে তারা সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে আত্মউন্নয়ন করতে পারছে না।’ 

তৃতীয়ত কারণ হিসেবে এই লেখক বলেন, ‘নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেনি৷ প্রচুর পড়াশোনা জানা শিক্ষিত মেয়েও পারিবারিক নানান চাপে নিজেদের কর্মবিমুখ করে রেখেছে। তাদের পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের আয়ের ওপরই ভরসা করে থাকতে হয়। অধিকাংশ নারীই কেবল ঘরকন্নাকেই তাদের স্বাভাবিক জীবন হিসেবে মেনে ও মানিয়ে নিয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটলে নারী মুক্ত চিন্তার অধিকারী হবে না। ফলে তার উপলব্ধিতে নিজস্ব বাড়ির চিন্তা কখনোই আসবে না।’