Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

জেন্ডার প্রসঙ্গ: জেন্ডার বৈষম্য ও লিঙ্গ উপযোগ বৃদ্ধির কানুন

জেন্ডার শব্দটি শুনলেই নারী ও পুরুষকে আলাদা সারিতে দাড় করিয়ে কল্পনা করি আমরা। আলাদা করি তাদের বেশভূষা ও কাজকর্মের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু জেন্ডার আইডিয়াটি তার চেয়েও অনেক ভিন্ন। লিঙ্গ বা সেক্স আমাদের একটি জন্মগত প্রক্রিয়া। জন্মের সময় মানুষের লিঙ্গ নির্ধারিত থাকে। কিন্তু জেন্ডার নির্ধারিত হয় জন্মের পর। অর্থাৎ, সেই মানুষের বড় হয়ে ওঠার সময়। এই সমাজ তার জন্য নির্ধারিত করে দেয়, সে কোন রঙ এর কাপড় পরবে, বেশভূষা কেমন হবে, কেমন করে কথা বলবে, আবার ছেলে মেয়ের জন্য আলাদা রঙও নির্ধারণ করে দেয়। 

 

 

একজন ছেলে বা মেয়ে শিশু সমান সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয়। জন্মের সময় সে এটা জেনে পৃথিবীতে আসে না সে নারী হয়ে পৃথিবীতে এসেছে নাকি পুরুষ হয়ে। কিন্তু সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা তাকে নারী বা পুরুষ হয়ে বেড়ে ওঠার শিক্ষা দেয়। সমাজবিজ্ঞান বলে, "সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি সমাজের নারী-পুরুষের প্রত্যাশিত ভূমিকা ও আচরণকে জেন্ডার বলে।" অর্থাৎ, জেন্ডার হচ্ছে মানুষের উপর আরোপিত একটা বহুল প্রচলিত সংস্কৃতি।  

 

এই সংস্কৃতি, সমাজের অনেক রকম কর্মকাণ্ডকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। জেন্ডারের ভিত্তিতে আরোপিত সংস্কৃতি নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও ভিন্ন ভিন্ন অধিকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেমন, নারীদের বহুদিন ধরে ঘরে বসে বিনা এপ্রিসিয়েশনে কাজ করা আর পুরুষের দিনরাত বাইরে বসে অর্থ উপার্জন করার সিস্টেমটা একটা জেন্ডার আইডিয়ার আরোপিত রূপ। আবার, নারী পুরুষকে জেন্ডারের ভিত্তিতে তাদের অধিকার আর আচরণের পার্থক্যের ভিন্নতাও জেন্ডারের এক আরোপিত রূপ। এই কারণে, তাদের সামাজিক মানদণ্ড আর অধিকার আলাদা হয় এবং এই সমাজ, এই অধিকারের ভিন্নতাকে সহজ ভাবে মেনেও নিয়েছে।

 

 

এই ভিন্নতাগুলোর কিছু উদাহরণ হলো:

 

শিক্ষা: নারী ও পুরুষের শিক্ষার জন্য সমান পরিমাণ বিনিয়োগ করতে অনিচ্ছুক দেখা যায় তাদের পরিবারকে। একটা মেয়ে যখন বড় হয় তখন তাকে বিবাহযোগ্যা বলে মনে করতে থাকে তার পরিবার৷  তাই পড়াশোনা ও চাকরিবাকরি সেখানে একটা বিলাসিতা হয়ে ওঠে। এছাড়া অনেক মানুষ এই ধারণা নিয়েই চলে যে, মেয়েরা পড়াশোনা করে কিছু করতে না পারলে তাকে একজন সফল চাকরিজীবী ছেলের হাতে তুলে দেয়া যায়। এরপর সেই মেয়েকে তার জীবন নিয়ে আর কিছুই চিন্তা করতে হবে না। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংজ্ঞাটা তখন নারীপুরুষ ভেদে ভিন্ন হয়ে যায়। 

 

 

স্বাস্থ্য ও পুষ্টি: এই সমাজে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ কর‍তেও কুণ্ঠাবোধ করতে দেখা যায়। নারীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেকটাই অপারগ হয়ে থাকে তাদের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক। যেমন নারীদেহে হিমোগ্লোবিনের চাহিদা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশী। কিন্তু অনেক নারী রক্তশুন্যতায় মারা যায়। গর্ভকালীন অবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পেরেও দীর্ঘমেয়াদি অনেক অসুখ বিসুখে পড়তে হয় নারীদের। 

 

 

বাকস্বাধীনতা: এই জেন্ডার প্রভাবিত সমাজ মনে করে, নারীরা মতামত পালন করার জন্যই পৃথিবীতে এসেছ। তাদের নিজেদের কোনো মতামত থাকতে পারে না। নিজেরা নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলতে পারবেনা। "ভালো মেয়ে" ও "খারাপ মেয়ের" সংজ্ঞা ভিন্ন হয়। যারা কথার উপরে কথা বলে না তারাই "ভালো মেয়ে" হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

 

সম্পদ বন্টন: উত্তরাধিকার সূত্রে যে সম্পদ বণ্টনের প্রক্রিয়া আছে সেটা জেন্ডার ভেদে ভিন্ন হয়।এর সাথে ধর্মীয় যোগসূত্র রয়েছে।  

 

 

প্রজননগত অধিকার: মা হবে যখন একজন নারীই। তখন তার গর্ভে সন্তান লালন করার সিদ্ধান্ত তার নিজেরই হওয়া উচিত। কিন্তু এই সমাজে সন্তান গর্ভে ধারণ করার সিদ্ধান্তও একজন নারী নিজ থেকে নিতে পারে না। পারিপার্শ্বিকতার চাপের উপর তার সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে হয়। 

 

 

এই সকল পার্থক্যের জন্য নারীর অনেক বৈষম্যের মাধ্যমে জীবন পার করতে হয়৷ কিন্তু এই সকল বৈষম্য দূরীকরণের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। জেন্ডার বৈষম্য টিকে আছে অনেক দিন ধরে তাই এই বৈষম্য ভাঙার পথটাও আরো অনেক লম্বা পথ হবে। তাই অল্প অল্প করে এই জেন্ডার বৈষম্য প্রথা ভাংতে হবে। 

 

তবে এজন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। যেমন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা, অভিভাবকদের মনোভাব সময়ের সাথে পরিবর্তন করা, প্যারেন্টিং এ আরো সচেতন হওয়া এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া।