Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

সংবাদপত্রের পাঠক কম, সমালোচক বেশি; তাই সাংবাদিক জীবন নিরাপত্তাহীন

সমাজের দর্পণ কিংবা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাংবাদিকতাকে খাতা-কলমে যতটা মূল্যায়ন করা হয়, আদতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারের যুগে সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিক উভয়ই রাষ্ট্র এবং নাগরিকের কাছে অবহেলিত। যার ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে যতটা অবমূল্যায়ন করে, ততটাই নিরাপত্তার অভাবে ভোগে একেকটি সাংবাদিক জীবন। উদাহরণ আমার, আপনার চোখের সামনেই; গত মঙ্গলবার থেকে, দৈনিক প্রথম আলো'র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণ।

 

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে যে ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তার উদ্দেশ্য খোঁজার জন্য বিশাল অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। গত বেশ কিছু মাস যাবত এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কলমে প্রথম আলো'তে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি, দায়িত্ব অবহেলা নিয়ে করা রিপোর্টগুলোতে চোখ দিলেই যথেষ্ট।

 

অপরদিকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিষ্প্রভ অবস্থান এবং সাংবাদিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ কম-বেশি কল্পনা করা যায়। তার চেয়ে সাংবাদিকতাতেই ফেরা যাক। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের অতীত, বর্তমানের কলম অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী রিপোর্টের জয়-জয়কার। তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য কানাডিয়ান অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্স ইন বাংলাদেশি জার্নালিজম (২০১১), টিআইবির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার (২০১৫), পিআইবি ও দুদকের উদ্যোগে দুর্নীতি প্রতিরোধে গণমাধ্যম পুরস্কার বাংলাদেশসহ (২০১৪) অনেকগুলো স্বীকৃতি পেয়েছেন।

 

কিন্তু এতো কিছুর পরও দেশের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরের মানুষের কাছে তিনি বড্ড অচেনা। শুধু তাই নয়, ফেসবুক, টুইটারে আলোড়ন তুলেনি তার সেইসব অনুসন্ধানী রিপোর্ট, ঠিক যতটা সাগ্রহে মানুষ গ্রহণ করে অপ-সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা। দেশ-বিদেশের সংবাদ পাঠের চাইতেও মানুষের (বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারকারী) আগ্রহের জায়গা থাকে সত্য, অলীক মিশ্রিত তথ্য বিবরণে যাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হয়তো দোষারোপ আর ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আর এই জন্যই পুরো জাতি এক ফোন রেকর্ড নিয়ে বিভক্ত হয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটায়; যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানসম্পন্ন রিপোর্ট শুধুমাত্র পাঠকের গ্রহণযোগ্যতার অভাবে হারিয়ে যায়।

 

প্রথম আলো'র এক প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়, গত ১৫ বছরে ২৩ জন সাংবাদিক এই দেশে হত্যার শিকার হয়েছে, বিচার হয়েছে ৮টির যার ৫টিই ভুক্তভোগী পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর এই সময়ের মধ্যে আহতের সংখ্যা ৫৬১ জন। 

 

অল্প কিছুদিন আগেই সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ৫৪ দিন নিখোঁজ থেকে পৌনে ২ মাস জেল-রিমান্ড শেষে মুক্তি পেল। তার করা অনুসন্ধানী রিপোর্টটি সেসময় ভাইরাল হয়নি, সেই সাংসদের দুর্নীতিরও বিচার হয়নি। তাই মানুষ শত শত ভালো উদাহরণ, ভালো কাজ আর মানসম্পন্ন সংবাদকে মনে করে না এবং মনে রাখেও না। নাগরিকদের কাছে এর চাইতেও আজকাল অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভাইরাল বিতর্কে অংশগ্রহণ, কিংবা আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খবর রাখার কাজ। 

 

আর এভাবেই সাধারণ নাগরিকদের মাধ্যমেই হেরে যায় হেরে যায় সাংবাদিকতা, জিতে যায় অপ-সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা। সাধারণ জনগণের এই উদাসীনতাই আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউজগুলোর আর্থিক ও নৈতিক দুরবস্থার কারণ হয়তো। একদিকে রাষ্ট্রের কাছে রীতিমতো নিগৃহীত(ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও রাজনীতিকদের বৈরিতার শিকার), সেই সাথে সাধারণ মানুষের আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, উদাসীনতা সাংবাদিকদের জীবনকে করেছে নিরাপত্তাহীন আর সাংবাদিকতায় তোষামোদি সংস্করণ বেড়েছে।

 

হয়তো ভাইরাল বিষয়বস্তুতে বিতার্কিক না হয়ে, একজন সংবাদ পাঠক এবং সচেতন নাগরিক হলে বরং দেশের সাংবাদিকতার এই হাল হতো না, সাংবাদিকদের জীবন নিরাপত্তা নিয়ে এই ছেলেখেলাও দেখতে হতো না।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ