“বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র“

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: মানুষ গড়ার বিমূর্ত চরিত্র

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: মানুষ গড়ার বিমূর্ত চরিত্র
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: মানুষ গড়ার বিমূর্ত চরিত্র
আজ ৫ই অক্টবর, “বিশ্ব শিক্ষক দিবস”। যদিও কবি বলেছেন, “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।“ কথাটি সত্য হলেও, আমাদের যাপিত জীবনে মানবিক এবং সভ্য হবার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যে শিক্ষা এবং তার নেপথ্যে শিক্ষকদের ভূমিকা অমূল্য। এ প্রসঙ্গে, গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডার তাঁর শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেছেন, “I am indebted to my father for living, but to my teacher for living well”. মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের এই অসামান্য অবদানকে সম্মান জানাতে ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কো ৫ই অক্টোবর দিনটিকে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বর্তমানে পৃথিবীর ১০০'র বেশি দেশ এই দিবসটি পালন করে থাকে।

আজ ৫ই অক্টবর, “বিশ্ব শিক্ষক দিবস”।

যদিও কবি বলেছেন, “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।“

কথাটি সত্য হলেও, আমাদের যাপিত জীবনে মানবিক এবং সভ্য হবার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যে শিক্ষা এবং তার নেপথ্যে শিক্ষকদের ভূমিকা অমূল্য।

এ প্রসঙ্গে, গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডার তাঁর শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেছেন,

“I am indebted to my father for living, but to my teacher for living well”.

মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের এই অসামান্য অবদানকে সম্মান জানাতে ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কো ৫ই অক্টোবর দিনটিকে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বর্তমানে পৃথিবীর ১০০'র বেশি দেশ এই দিবসটি পালন করে থাকে।

তাই, বিশ্বের সকল শিক্ষকদের সম্মান জানানোর পাশাপাশি আজ আমরা জেনে নিবো দেশের বিশিষ্ট চারজন শিক্ষক সম্পর্কে।

 

রমা চৌধুরী 

 

সকল বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে জাতিকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে অনবদ্য ভুমিকা রাখা এক নারীর নাম রমা চৌধুরী। ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর  জন্মগ্রহন করেন বীরাঙ্গনা এই নারী। জন্মস্থান  চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রাম।  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে বাংলা ভাষা সাহিত্য বিষয়ে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি দক্ষিণ চট্রগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর।  ষাটের দশকে তখন নারীদের উচ্চশিক্ষা এতো সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সে কঠিন কাজকেই সহজে সম্পন্ন করেছেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে যোগদান করেন। প্রায় দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন।

  ১৯৭১ সালের ১৩ মে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে আক্রমণ  করে পাশবিক নির্যাতন চালায় তার ওপর। শুধু সম্ভ্রম নষ্ট করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি তারা তার জীবন নেয়ার চেষ্টা করেছিল পাক বাহিনিরা।  তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ির পাশের পুকুরে লুকিয়ে থাকেন জীবন বাঁচাতে।  জীবন বাচলেও পরবর্তীতে এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের কাছে তিনি একজন  ধর্ষিতা নারীর পরিচয়েই উপেক্ষিত হতে  থাকেন বাকি বীরাঙ্গনাদের মতোই। কিন্তু  একজন ধর্ষিতা হিসেবে লজ্জায় মাথা নত করে ঘরে মুখ লুকিয়ে থাকেনি এই নারী। যে সমাজ তাকে ধর্ষিতা পরিচয়ে একঘরে করতে চেয়েছিলেন  তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন সে সমাজকে শিক্ষা প্রদানের। 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও কিছুকাল শিক্ষকতা করে জীবনযাপন করেন। তারপর তিনি অবশ্য লেখালেখিকেই পেশা হিসেবেই গ্রহন করেন।  নিজের লেখা বই নিজেই পথে পথে ঘুরে বিক্রি করতেন। চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিত ভিজে খালি বই বিক্রি করতেন। তিনি বলতেন  যে দেশের মাটিতে তাঁর ছেলেরা ঘুমিয়ে আছে, সেই মাটিতে জুতা পরে হাটতে চান না তিনি।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বাসার সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান। ২০১৮ সালের রা সেপ্টেম্বর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 

 

একজন হার না মানা লড়াকু নারীর রমা চৌধুরী।  গোটা জীবন স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী আর আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শিখিয়ে গেছেন বহু নারীকে।

 

মাহফুজা খানম 

 

শিক্ষক দিবসে যে শিক্ষিকার  কথা না বললেই নয় তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক মাহফুজা খানম।  দশভুজার মতোই এই নারী সামলেছেন দশ দিক। তিনি  একজন শিক্ষিকা, শিক্ষাবিদ, নারীনেত্রী, সমাজসেবী, মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং একমাত্র নারী ভিপি।দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি দিয়েছেন তার সর্বোচ্চটা।  বিশেষ করে নারী শিক্ষায়।  

১৯৪৬ সালে বাংলা সনের পহেলা বৈশাখ কলকাতায় জন্ম মাহফুজা খানমের৷ পিতা মুস্তাফিজুর রহমান খান৷ মা সালেহা খানম৷ 

মাহফুজা খানম তার স্কুলজীবন সম্পন্ন করেছেন  বাংলা বাজার গার্লস স্কুল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে মাস্টার্স করেছেন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে লন্ডনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পান। কিন্তু রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় তৎকালীন পাকিস্তানের মোনায়েম সরকার ওনাকে পাসপোর্ট দেননি। তাই  সেযাত্রায় স্কলারশিপ গ্রহনের সুযোগ হয়নি তার। 

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি তুলে ধরার  ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন মাহফুজা খানম। এরপর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং সত্তরের নির্বাচন নির্বাচন পরবর্তী সংকটে যারা বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে  মাহফুজা খানম। 

পড়াশোনার পাট চুকিয়ে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইডেন কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন মাহফুজা৷  ঢাকা   বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৬৬ - ৬৭ ডাকসু নির্বাচনে প্রথম নারী ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।  বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটরের সদস্য হিসেবে আছেন। এছাড়াও তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেছেন। অধ্যাপক মাহফুজা খানম ২০১৩ সালের ২৬ আগস্টঅনন্যা শীর্ষ দশ ২০১৩পুরস্কার সম্মাননা পান।

অবহেলিত শিক্ষার্থীদের সামনে সর্বদা আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। বিশেষ করে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা সোচ্চার থাকেন।  শিক্ষার আর্থিক তহবিলের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭টি শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছেন মাহফুজা খানম।  শুধু শিক্ষিকা হিসেবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষা প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি এই নারী।  নিজে সফল হয়েছেন এবং চেষ্টা করেছেন সকল নারীকে সফল করার এবং সকল অবহেলিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাড়ানোর।

শোভা রানী ত্রিপুরা

একজন শিক্ষিকা, কবি কথাসাহিত্যিক শোভা ত্রিপুরার জন্ম ফেব্রুয়ারী ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বরকল উপজেলায়। কিন্তু বাবার চাকরিসূত্রে শোভা ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়িতে বসবাস করেন। শৈশব থেকেই তাঁর লেখালেখিতে বিশেষ আগ্রহ ছিল। তবে লেখালেখির হাতেখড়িটা হয় কৌশোর না পেরোতেই৷

শোভা ত্রিপুরা ত্রিপুরীয় জনগোষ্ঠীর একজন মহীয়সী মহিলা এবং পেশায় একজন শিক্ষক। পাহাড়ি অঞ্চগুলোর ছেলে মেয়েদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন জ্ঞানের আলো। শিক্ষকতার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা আর লেখালেখিতেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ। শোভা ত্রিপুরা নিজ জনগোষ্ঠীর একজন উদ্যমী নারী।

আদিবাসী জীবনযাত্রা ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, গান, উপন্যাস ইত্যাদি। গল্প, কবিতা দিয়ে মাতিয়েছেন পাঠকদের।
এভাবেই হয়ে উঠেছে তার সাহিত্যচর্চা। তিনিকথাসাহিত্যআরলোকসাহিত্যতুলে ধরেন মন দিয়ে। লেখালেখির জন্য একজন মানুষের যে ব্যাকুলতা দরকার, সবটুকু লালন করেন এই মহিয়সী নারী।
তাঁর বিভিন্ন লেখায় পাহাড়ি জনজীবনের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি ভেসে উঠেছে সমতলে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রার কথাও।

১৯৭৭ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন শোভা। এখনো শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত তিনি।
বর্তমানে তিনি জেলার মহালছড়ি চৌংড়াছড়িমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার কথা তাঁর। শোভা ত্রিপুরা জানালেন, কেবল পুঁথিগত শিক্ষা নয়; শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী শিক্ষা দেয়াই তাঁর কাজ। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিল্প, সাহিত্যবোধ আর জীবনগঠনের জন্যে যথার্থ মূল্যবোধ বিষয়টিকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

১৯৮৪ সালে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন লেখক গবেষক মংছেনচীং রাখাইন (মংছিন) কে৷ তাঁর স্বামী মংছেনচীং সাহিত্যে ২০১৬ সালে একুশে পদক পান।শিক্ষকতার পাশাপাশি এভাবে লেখক শোভা ত্রিপুরার এগিয়ে চলা শুরু হয়। কেবল লেখালেখি করেন তাই নয়, সমাজসেবায়ও শোভা রানীর আছে ভূমিকা। জীবনের প্রথমদিকে নিজে গিয়ে দৈনিক গিরিদর্পণ আর দৈনিক অরণ্যবার্তায় লেখা দিয়ে আসতেন। ডাকঘরের মাধ্যমেও লেখা পাঠাতেন তিনি। দুটি দৈনিক ছাড়াও রাঙামাটি থেকে প্রকাশিতসাপ্তাহিক বনভূমিপত্রিকায় বহু কবিতা, ছড়া, গল্প প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের কয়েকটি পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে তাঁর কয়েকটি লেখা প্রকাশ পেয়েছে।

শোভা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দিচ্ছেন তা নয়, নিজের দুই কন্যা সন্তানকেও সঠিক পথে নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে খুব গর্ববোধ করেন শোভা ত্রিপুরা।
রত্নগর্ভাএই নারীর দুই কন্যাই স্ব স্ব মহিমায় আলো ছড়াচ্ছে ছোট কন্যা চেনচেননু জাতীয় রচনা প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত।বড় কন্যা প্রিয়াংকা পুতুল রাঙামাটি সদর শুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা পদে কর্মরত আছেন।

আদিবাসী জনজীবন ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, গান, উপন্যাস মিলে সর্বমোট ১৪ টি গ্রন্থ লিখেছেন। যা দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে প্রকাশ পেয়ে আসছে। তাঁর প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে, ঝরাপাতা (কবিতা) ১৯৯৬, ত্রিপুরা জাতির ইতিকথা ২০০১, ত্রিপুরা জাতির রূপকথা ২০০২, জাতক (বুদ্ধ) ২০০৪, ত্রিপুরা জাতি ২০০৭, ত্রিপুরা জাতির ইতিবৃত্ত, আলোময়ীমা ত্রিপুরেশ্বরী, শুভ বাংলা নববর্ষ ২০১২, স্বপ্নের ধূসর ছায়া (গল্প) ২০১৩, ‘রাখাইন ত্রিপুরা জাতিসত্তা২০১৪, ধূসর পাহাড়ে সবুজ তারুণ্য (গল্প) ২০১৪, ত্রিপুরা জাতির কিংবদন্তী ২০১৪, একুশের অপরাজিত কথামালা (নাটক) ২০১৪, গিরি নন্দিনী (কবিতা) ২০১৪ আলোক নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহার ভদন্ত চন্দ্রমণি মহাথেরো প্রভৃতি। শোভা ত্রিপুরার সাহিত্য কর্মের বেশি অংশ জুড়ে নিজ জাতি-ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, ইতিহাস স্থান পেয়েছে। তাছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম জাতক, রাখাইন জীবনধারা ইত্যাদি নিয়েও কাজ রয়েছে তাঁর।

শোভা ত্রিপুরা ১৯৭৩ সালে ঢাকার বঙ্গবভনে কৃতি যুব সংবর্ধনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে ঢাকা নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা কক্সবাজার তিন পার্বত্য জেলার লেখিকা হিসেবে সংবর্ধিত হন। অতঃপর মহান 'স্বাধীনতা জাতীয় দিবস২০১২-এর ২৬ মার্চ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা মহালছড়ি উপজেলা সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ কর্তৃক সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকেসংবর্ধনাপ্রদান করা হয়।

১৯৮৫, ১৯৮৬ এবং ২০০০ সালে মহালছড়ি উপজেলাসহ খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলারশ্রেষ্ঠ শিক্ষিকাহিসেবে নির্বাচিত হন তিনি৷ ১৯৮১ সালে তিনিরাঙ্গামাটি বনভূমি সাহিত্য পুরস্কারএবং ১৯৮০ সালে রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট হতে রূপকথা প্রথম, ১৯৮৫ সালে পুনর্বার রূপকথা শাখায় উপজাতীয় রূপকথা তৃতীয় পুরস্কার পান। বাংলাদেশ আদিবাসী কবি পরিষদ বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রামঅঞ্চল রাঙ্গামাটি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা থেকে কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্যসম্মাননা সনদ’, সিরাজগঞ্জ বিশ্ব বাংলা সাহিত্য উৎসব২০১২ উপলক্ষে কবিতা ক্লাব আয়োজিতসৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীপুরস্কার প্রদান করা হয়। মুর্শিদাবাদ রাহিলা সংস্কৃতি সংঘ-এর ২৯ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে, ২১ ফেব্রয়ারির বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে এবং বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষিতে সাহিত্য সংস্কৃতি উৎসব-এররাহিলা সাহিত্য পুরস্কার-২০১৪প্রদান করা হয়।আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৬ উপলক্ষে মহালছড়ি সদর জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রম-২০১৬এর আওতায় শিক্ষা চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন।
রাঙ্গামাটি জেলাশহরের দৈনিক গিরিদর্পণ পত্রিকার ৩৪তম বর্ষপূর্তি ৩৫তম পদাপর্ণ উপলক্ষে তাকেস্মারক সম্মাননা-২০১৭” প্রদান করা হয়।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া পদক২০১৭ লাভ করেন।
একজন পাহাড়ি নারী হিসেবে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শোভা ত্রিপুরা৷ শিক্ষকতার পাশাপাশি কবি হিসেবেও সুনাম ছড়িয়েছে শোভা ত্রিপুরার৷ 

অধ্যাপক শরিফা খাতুন

একজন নারী ভাষা সৈনিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সমাজকর্মী শরিফা খাতুন ফেনী মহকুমার শশ্মদি ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামে ডিসেম্বর ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আসামের রেলওয়েতে চাকরি করতেন। পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে আসামেই থাকতেন। তার বাল্যকাল কেটেছে আসামেই। আসামে বাংলা শিক্ষার সুযোগ না থাকায় শরিফা খাতুনকে তারা বাবা-মা কুমিল্লাতে তার খালার বাসায় পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকেই তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। কুমিল্লা শহরের লুৎফুন্নেসা স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন।

লুৎফুন্নেসা স্কুলে পড়াকালীন সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন তার চাচা তাকে ফেনীতে নিয়ে ভর্তি করান। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে নোয়াখালী সদরের উমা গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৩ সালে ইডেন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) , ১৯৫৮ সালে এমএ পাস করেন।

স্কুল ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দুএকটি মিছিলে তিনি অংশ নেন। তখনো ভাষা আন্দোলন শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগের পর ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গটি প্রকাশ্যে আসে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তখন আন্দোলনটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। স্কুলের ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরার সে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সকালবেলার কথা স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন শরিফা খাতুন। সেদিন সকালেই ১৪৪ ধারা জারি হয়ে গেছে। তবে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের লক্ষ আমতলার সভায় অংশগ্রহণ করা। ছাত্রীরা সকালবেলা উঠে প্রস্তুত হন। ততক্ষণে কলেজের গেট তালাবদ্ধ। ফটকে তালা লেয়ে শরীফাসহ আরো কয়েক ছাত্রী গাছ ডাল বেয়ে দেয়াল টপকে কলেজ আঙিনা থেকে বের হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় চলে যান। অংশ নেন ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে।

১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরেকটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। তখন অনেক ছাত্রী গ্রেপ্তার হয়। সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙার দায়ে ছাত্রীদেরও পুলিশ ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সেদিন গ্রেফতার হওয়া ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২০-২১ জন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক লায়লা নূরও ছিলেন তাদের সঙ্গে। লায়লা নূরের সঙ্গে মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন শরীফা খাতুন। ২১ ফেব্রুয়ারীর পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করে তাতে যখন শ্রদ্ধা অর্পণ করা হয়, সেটিতেও অংশ নিয়েছিলেন শরিফা খাতুন। মাতৃভাষার বাংলার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করেছেন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে।
যার ফলে, ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

দেশ স্বাধীনের পর অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হল শরিফা খাতুন। শিক্ষক সমাজসেবী রেখেছেন অনেক দৃষ্টান্ত। তার এই অবদান মোটেও ভোলার মত নয়।