Skip to content

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাল্যবিয়ে শিকার নারীদের ভবিষ্যৎ কী

বাল্যবিয়ে নারীর জীবনকে সবদিক থেকে ঝুঁকির সম্মুখীন করে তোলে। তবু একুশ শতকে এসেও নারীদের বাল্যবিয়ে সমূলে প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে না। পিতা-মাতার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার শিকার হচ্ছে কোমলমতি মেয়েরা। যার জের টেনে নিয়ে বেড়াতে হতে পারে সারাজীবন।

জীবনে যে সময়টা মেয়েদের হেসে-খেলে বেড়ে ওঠার উপর্যুক্ত সময় তখনই তাকে কাঁধে নিতে হচ্ছে অন্য একটি পরিবারের সদস্যদের ভার। মেয়েদের বাল্য বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে পাঠিয়ে বাবা-মা দায়মুক্ত হতে চান। কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে, এটা শুধু বাল্যবিয়েই নয়। এর সঙ্গে যৌতুকের বেশ যোগসাজশে রয়েছে। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মেয়ের বিয়ে দিতে বাপকে গুনতে হচ্ছে উপঢৌকনের নামে যৌতুক। কিন্তু এই বাবা-মা সেই অর্থ খরচ করে মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় করাচ্ছেন না।

অনেকের মতে, মেয়ে বেশি পড়ালেখা করে লাভ নেই। অনেকে ধর্মের অপব্যাখ্যা দাঁড় করায় আবার অনেকে মেয়ের স্বাধীন হওয়াকেই পছন্দ করেন না। গ্রামাঞ্চলেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। শহরে বাবা-মায়েরও যে এ ধরনের মানসিকতা নেই তা নয়। বাংলাদশের প্রায় নব্বই ভাগ মানুষই গ্রামকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামের আবহে বেড়ে উঠে অধিকাংশের মানসিকতা আজও এমনই। কিন্তু একটি বাল্যবিয়ে নারীর কি ভবিষ্যৎ দিতে পারে?

নাটোরের বাগাদিপাড়া উপজেলার বাগাদিপাড়া মহিলা মাদ্রাসা স্কুলের থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ১৫ জন শিক্ষার্থীর। কিন্তু পরীক্ষায় কেউই অংশ নেয়নি। প্রত্যেকেই বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে সংসারের জালে জড়িয়েছে। তাদের কেউ কেউ তথ্য গোপন করে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির কেউ চায় না তারা পড়াশোনা করুক। এমনকি তার নিজের বাবা-মাও তা চায় না। স্বামীর ঘরে শোভাবর্ধন করেই সে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে এই তাদের বাসনা।

নারীদের সচেতনতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সেমিনার, পাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাল্যবিয়ের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। সুস্থ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায় সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।

সেক্ষেত্রে এই দুই পরিবারেরই নারীটিকে নিয়ে কোনোই আক্ষেপ দেখা যায় না। বরং তাদের পড়াশোনা কেন বন্ধ, কেন তারা বাল্যবিয়ের শিকার এ বিষয়ে কথা বলতেই অভিভাবকরা বিব্রত! সব মেয়েদেরই অভিন্ন চিত্র। কিন্তু জীবন তো সহজ-সরল পথে চলার চেয়ে বাঁকা পথেই বেশি চলে। সেক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের ফলে এই মেয়েদের সঙ্গে ঘটতে পারে নানবিধ সমস্যা। তখন এদের পরিস্থিতি কী হবে? পরিবারগুলো, সমাজে কেউ কি ভেবেছে কখনো?

বাল্যবিয়ের শিকার নারীরা প্রথমত স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন। অল্প বয়সে বিয়ে শরীরে টেনে আনতে পারে নানারকম অসুখের। এছাড়া অল্প বয়সে বিয়ে হতে না হতেই এই নারীরা সন্তান প্রসব করেন। সেক্ষেত্রে অপুষ্টি, অতিরিক্ত প্রেশারে নারীর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাসা বাঁধতে পারে। গবেষণায় প্রমানিতও। তবু পরিবার-সমাজে মেয়েদের বাল্যবিবাহ নিয়ে পিতা-মাতার এতটুকু ভ্রূক্ষেপ নেই!

বাল্যবিয়ের ফলে অল্প বয়সে নারীকে কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে সংসার-সন্তানের ভার। নারীরা বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক পরিবেশ পাচ্ছে না। তাদের এই মানসিকতা তারা নিজেদের সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করছে। ফলে চক্রাকারে এই জেনারেশনের সবাই একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। পড়াশোনা করে নিজের ভাগ্য বদলানোর পথে তারা হাঁটছে না। বাল্যবিয়ে নারীর জীবনে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, মানসিকভাবে দুর্বল করে, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল করে, নির্ভশীলতা বাড়ায় স্বামী বা পরিবারের ওপর, স্বাধীন জীবন পালনে বাধা, একাকীত্ব, হতাশা, বিষাদে পরিণত করে জীবন ধীরে ধীরে। সন্তান লালন-পালন, সংসারে দায়িত্ব পালন করতে করতে ছোট্ট মেয়েটি নিজের জীবনকেই হারিয়ে ফেলে।

বাল্যবিয়ে বন্ধে সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সেদিক থেকে সাধুবাদ জানালেও বিরাট অংশ এই ছত্রছায়ার বাইরে। আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে মেয়েদের বয়স এভিডেভিড করে নিয়ে বিয়ের পীড়িতে বসাচ্ছে। এখন আইনকে আরও কঠোর করতে হবে। জেল, জরিমানা বৃদ্ধি করতে হবে। নারীদের সচেতন করতে হবে। স্কুলে স্কুলে ক্যাম্পেইন করতে হবে। ছোট ছোট পথ নাটক করে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

নারীদের সচেতনতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সেমিনার, পাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাল্যবিয়ের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। সুস্থ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায় সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ