নতুন রূপে - রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত

নতুন রূপে - রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত
নতুন রূপে - রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত
শ্রীকান্ত উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিচরণক্ষেত্র পরিচালকের মননে। কিশোর শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদির পর্ব খানিক গল্প থেকে, খানিক কল্পনাপ্রসূত। যুবক শ্রীকান্ত কর্পোরেট ‘ভবঘুরে’। যে চাকরি করে না, চাকরি বেছে নেয়। এই গল্পে রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে শ্রীকান্তের দেখা শহর থেকে দূরে, সমসময়ে। গড়গড়া ছেড়ে সিগারেট ধরেছে পিয়ারি, ইংরেজিও বলে সে। উপন্যাসের মতো সিনেমার শ্রীকান্তও আদ্যন্ত ‘ভ্যাগাবন্ড’। আবার বাস্তব এবং বিনির্মিত ইউটোপিয়ান জগতের বিরোধে তার মধ্যে জন্ম নেয় পলায়নী মনোবৃত্তি। একঘেয়ে জীবনে ক্লান্ত শ্রীকান্ত চাকরি ছেড়ে দেয়। শহর ছেড়ে হুকুমচাঁদের পাহাড়ি আস্তানায় আসতে আসতেই বদলে যায় তার জীবন। তার কৈশোরের প্রেমিকা রাজলক্ষ্মীকে নস্ট্যালজিয়ার ঘোর লেগে থাকা চোখে, হুকুমচাঁদের রক্ষিতা রূপে দেখে সে।

শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, ইন্দ্রনাথ, অন্নদাদিদি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্ত’র এই চরিত্রগুলোকেই ১৯ শতক থেকে তুলে ২১ শতকের দ্বিতীয় দশকে এনে জীবন দিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। উপন্যাসের মূল নির্যাসটুকুর সঙ্গে পরিচালক মিলিয়েছেন আধুনিক মনন ও মনস্তত্ত্ব। প্রথাগত জঁর ভেঙে শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, অন্নদাদিদি ও ইন্দ্রনাথকে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’- তে নিজের দর্শনের ঘরানায় সাজিয়ে হতে চাইলেন শরৎ-এর সমগোত্রীয় ঈশ্বর। 
হতে পেরেছেন কিনা সে নিয়েই একটু কথাবার্তা বলবো এবার।


শরৎ-এর উপন্যাস ছেড়ে ২০১৯-এর সিনেমায় ঠাঁই নেওয়া এই গল্পের প্লট নিশ্চিন্দিপুর। পুরুলিয়ার রুক্ষতাকে কাটিয়ে এসে মেশে যা নিশ্চিন্দিপুরের সমুদ্র-মোহনায়...যে-সম্দ্রুসৈকত আদতে নানা ভাঙাগড়ার সাক্ষী। যে তীরে আলসেমিতে ভরপুর সূর্যাস্তে হয়ত গড়ে উঠেছে কিংবা গড়ে উঠতে পারেনি নতুন কোন আশ্রয়, দানা বাঁধতে পেরেছে বা পারেনি নতুন স্বপ্নগুলো। এই বাস্তব এবং স্বপ্নকল্পনার মাঝে রয়েছে যে-পরাবাস্তবের জগৎ, সেখানে এসে পরিচালক থামতে চেয়েছেন। ভাবনার একটা পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন দর্শকদের জন্য। শ্রীকান্ত উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিচরণক্ষেত্র পরিচালকের মননে। কিশোর শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদির পর্ব খানিক গল্প থেকে, খানিক কল্পনাপ্রসূত। যুবক শ্রীকান্ত কর্পোরেট ‘ভবঘুরে’। যে চাকরি করে না, চাকরি বেছে নেয়। এই গল্পে রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে শ্রীকান্তের দেখা শহর থেকে দূরে, সমসময়ে। গড়গড়া ছেড়ে সিগারেট ধরেছে পিয়ারি, ইংরেজিও বলে সে। উপন্যাসের মতো সিনেমার শ্রীকান্তও আদ্যন্ত ‘ভ্যাগাবন্ড’। আবার বাস্তব এবং বিনির্মিত ইউটোপিয়ান জগতের বিরোধে তার মধ্যে জন্ম নেয় পলায়নী মনোবৃত্তি। একঘেয়ে জীবনে ক্লান্ত শ্রীকান্ত চাকরি ছেড়ে দেয়। শহর ছেড়ে হুকুমচাঁদের পাহাড়ি আস্তানায় আসতে আসতেই বদলে যায় তার জীবন। তার কৈশোরের প্রেমিকা রাজলক্ষ্মীকে নস্ট্যালজিয়ার ঘোর লেগে থাকা চোখে, হুকুমচাঁদের রক্ষিতা রূপে দেখে সে। 


এই পর্যন্ত ছবির প্লট লিনিয়ার। শ্রীকান্তর ফেলেআসা জীবনের সঙ্গে সংযোগসূত্র তৈরি হয়ে যায় ফ্ল্যাশব্যাকে। বয়ঃসন্ধিকালে ইন্দ্র দাদাই ছিল শ্রীকান্তর অন্যতম প্রধান আশ্রয়। সেই নির্ভরতার সূত্রটি পরিচালকের মুনশিয়ানায় প্রকাশ পেয়েছে ছবিতে। নির্বাক-ধূসর এই ছবির সংলাপ, ছবির গান। এমনিতে সংলাপের ব্যবহার খুবই অল্প। গানের মাধ্যমেই মুহূর্তকে বুনেছেন পরিচালক। তবে এতসব অতিক্রম করেও ছবির শেষে দর্শকের মনের মধ্যে রয়ে যায় অব্যক্ত এক অতৃপ্তি। এই অস্পূর্ণতা দর্শক-মনে ক্ষণে ক্ষণেই প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নের জন্ম দেয়।


যাঁরা প্রদীপ্ত’র ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’, ‘পিঙ্কি, আই লাভ ইউ’ দেখেছেন তাঁরা যদি সেই মাপদ- নিয়ে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-কে বিচার করতে বসেন, তাহলে নির্ঘাৎ হতাশই হতে হবে। এই ছবি অনেক বেশি বাণিজ্যিক, অনেকবেশি ‘সোজা পথের’। তাই কিছু সময়ের ব্যবধানেই চলে আসে গান। যদিও প্রতিটি গান বড়ই শ্রুতিমধুর। শুধু গান নয়, ঘুঘু-পেঁচার ডাক-কখনও জলের ছলাৎছল শব্দে মোড়া ছবির আবহসংগীত অডিও ভিজ্যুয়ালকে নিয়ে গেছে অন্য এক চূড়ায়। ‘সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায়’ এই প্রথম সিনেমার আবহসংগীত করলেন। তার কাজ নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত। 


ছবির শুরুতেই লেখা থাকে, ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রথমপর্বে অনুপ্রাণিত। তবে নামগুলো বাদে আর শ্রীকান্ত-ইন্দ্রনাথের কম বয়সের ‘অভিযান’গুলো বাদ দিলে উপন্যাসের ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া মুশকিল। উপন্যাসে দেখা শ্রীকান্ত  ঋত্বিক চক্রবর্তী হয়ে ধরা দেয় সিনেমার পর্দায়। হলুদ পাঞ্জাবি আর জিনসের সাদামাটা লুকে শ্রীকান্ত চরিত্রে অনবদ্য ঋত্বিক। তবে নাম যাই হোক, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ প্রদীপ্ত’র সিনেমার অন্যান্য চরিত্রে অপরাজিতা ঘোষ দাস (অন্নদাদিদি), সোহম মৈত্র (কৈশোরের শ্রীকান্ত), সায়ন ঘোষ (ইন্দ্রনাথ) যথার্থ অভিনয় করেছেন।
তবে, রাজলক্ষ্মী চরিত্রে জ্যোতিকা জ্যোতির অভিনয়ের আড়ষ্টতা অনেক সময়েই গল্পের ছন্দের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এই ছবির প্রধান আকর্ষণ ছবির চিত্রগ্রহণ এবং সংগীত। চরিত্রের অন্তর্লীন অভিব্যক্তি তথা পরিবেশের সুন্দর অবয়ব প্রকাশে শুভদীপ দে-র ক্যামেরার কাজ প্রশংসনীয়। মনে থেকে যায় বাউলের সংগীত কিংবা ‘আমার এই শুধুই চাওয়া...’ গানগুলি।

----