৭ নভেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২২ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

সমুদ্রের কাছে গেলেই মন ভালো হয়ে যায় কেন?

IMG_7499

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন সমুদ্র। বিশাল নীল জলরাশি, ঢেউয়ের অবিরাম ছুটে চলা আর গর্জনের মায়াবী শব্দ—সব মিলিয়ে সমুদ্রের কাছে গেলে যেন মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ ভুলে মানুষ খুঁজে পায় একধরনের প্রশান্তি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সমুদ্রের কাছে গেলেই কেন এমন অনুভূতি হয়? এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ।

ডাচ্‌ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বলেছিলেন, ‘সমুদ্রের নীলের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা দুঃখ-কষ্ট মুহূর্তেই দূর করে দেয়।’ কথাটির সঙ্গে বিজ্ঞানেরও কিছু যোগসূত্র রয়েছে।

সমুদ্রের বাতাস ও মানসিক প্রশান্তি

সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার সময় বাতাসে বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র কণা ও আয়ন তৈরি হয়। সমুদ্রের বাতাসে থাকা এসব উপাদান পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। তবে ঋণাত্মক আয়ন সরাসরি সুখ বাড়ায় বা সেরোটোনিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়—এমন দাবির পক্ষে এখনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে খোলা পরিবেশে সময় কাটানো, নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।

নীল রং কেন মনকে শান্ত করে?

সমুদ্রের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে বিশাল নীল জলরাশি। নীল রং সাধারণত প্রশান্তি, শীতলতা ও স্থিরতার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সমুদ্র ও আকাশের বিস্তৃত নীল দৃশ্য আমাদের মনোযোগকে দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা থেকে সরিয়ে প্রকৃতির দিকে নিয়ে যায়। ফলে মন কিছুটা হালকা হয় এবং মানসিক ক্লান্তি কম অনুভূত হতে পারে।

Advertisements

ঢেউয়ের শব্দে মেলে স্বস্তি

সমুদ্রের ঢেউয়ের একটানা শব্দ আমাদের মস্তিষ্কে প্রশান্তিদায়ক প্রভাব ফেলতে পারে। ঢেউয়ের ওঠানামার ছন্দ এবং পানির গর্জন অনেকটা প্রাকৃতিক হোয়াইট নয়েজের মতো কাজ করে। আশপাশের বিরক্তিকর শব্দ আড়াল করে এটি মনোযোগ ধরে রাখতে ও শিথিল হতে সাহায্য করে। এ কারণেই অনেকেই সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাতে বা ধ্যান করতে পছন্দ করেন।

সূর্যের আলো ও সেরোটোনিনের ভূমিকা

সমুদ্রসৈকতে গেলে সাধারণত মানুষ খোলা আকাশের নিচে বেশি সময় কাটায়। সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে সহায়তা করে। এ ছাড়া দিনের আলো আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত দিনের আলো মানসিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা এবং ত্বক সুরক্ষিত রাখা জরুরি।

সমুদ্রের পানিতে গোসলের অনুভূতি

সমুদ্রের পানিতে সাঁতার কাটা বা গোসল করা শরীরকে সতেজ অনুভব করাতে পারে। পানির শীতল স্পর্শ স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। একই সঙ্গে পানিতে সাঁতার কাটার ফলে শরীরের পেশিগুলো সক্রিয় হয় এবং শারীরিক ব্যায়ামের উপকার পাওয়া যায়। ব্যায়াম মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

ব্লু মাইন্ড থিওরি: পানির কাছাকাছি থাকলে কেন শান্ত লাগে?

সমুদ্রের কাছে গেলে মানুষের মনে যে প্রশান্তি তৈরি হয়, তা ব্যাখ্যা করতে জীববিজ্ঞানী ওয়ালেস জে. নিকোলস তাঁর ‘ব্লু মাইন্ড’ বইয়ে ‘ব্লু মাইন্ড’ ধারণার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পানি দেখা, পানির শব্দ শোনা কিংবা পানির সংস্পর্শে থাকা মানুষের মস্তিষ্কে শান্ত ও শিথিল অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এতে মানসিক চাপ কমার পাশাপাশি মনোযোগ ও সৃজনশীলতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে সমুদ্রের বিশালতা, নীল রং, ঢেউয়ের শব্দ, সূর্যের আলো এবং পানির সংস্পর্শ—সবকিছু মিলে আমাদের মনে তৈরি করে এক বিশেষ প্রশান্তির অনুভূতি। তাই সমুদ্রের কাছে গেলে মন ভালো হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কেবল আবেগের ব্যাপার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্ক, শরীর ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক।

Advertisements