২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ৯ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্য কামনায় দেবীর আরাধনা

images (34)

হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আজ রোববার (২৫ অক্টোবর)। শারদীয় দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই পূজা উদ্‌যাপন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে দেবী লক্ষ্মী ভক্তদের গৃহে আগমন করেন এবং তাদের ধনসম্পদ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য দান করেন। এ কারণে পূজার পাশাপাশি রাত জেগে দেবীর আরাধনা করার রীতি প্রচলিত রয়েছে।

কোজাগরী পূর্ণিমা বা কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অনেক পরিবারে ব্যক্তিগতভাবে এই পূজার আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও সর্বজনীনভাবেও পূজা অনুষ্ঠিত হয়। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা ছাড়াও অনেক হিন্দু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার দেবী লক্ষ্মীর বিশেষ পূজা করার প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া কিছু অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধ্যায়ও লক্ষ্মীপূজা করা হয়।

হিন্দুধর্মের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবী লক্ষ্মী ধনসম্পদ ও ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য, সৌভাগ্য, জ্ঞান, আলো, উর্বরতা, সাহস ও দানশীলতার প্রতীক হিসেবেও তাকে মানা হয়। সংসারে সুখ-শান্তি ও আর্থিক সমৃদ্ধি কামনায় ভক্তরা দেবীর আরাধনা করেন। দেবী লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা। হিন্দু ধর্মীয় কাহিনি অনুসারে, বিষ্ণু যখন রাম ও কৃষ্ণ রূপে অবতীর্ণ হন, তখন লক্ষ্মী যথাক্রমে সীতা ও রাধা রূপে তার সঙ্গিনী হন। প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ গৃহস্থরা ধনসম্পদ ও সমৃদ্ধি লাভের আশায় দেবী লক্ষ্মীর পূজা করে আসছেন।

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে ওই দিন বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে। তিথি শেষ হবে ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে। পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে ভক্তরা নিজেদের ধর্মীয় রীতি ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী পূজা-অর্চনা করবেন। এ উপলক্ষে অনেক বাড়িতে বিশেষ আয়োজন করা হয়। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, পূজার স্থান সাজানো এবং দেবীর উদ্দেশে নৈবেদ্য নিবেদন এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লক্ষ্মীপূজায় বিভিন্ন ধর্মীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সিঁদুর, পূজার ঘট, ধান, মাটি, আম্রপল্লব, ফুল, দূর্বা, তুলসীপাতা, হরীতকী, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ, নৈবেদ্য, আতপ চাল ও জল। পূজার আয়োজনের পাশাপাশি অনেক বাড়িতে মঙ্গলঘট স্থাপন করা হয় এবং ধানের ছড়া দিয়ে পূজার স্থান সাজানো হয়। বাঙালি হিন্দু পরিবারের নারীরা এ উপলক্ষে অনেক সময় উপবাসব্রত পালন করেন। বাড়ির আঙিনা ও প্রবেশপথে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকার রীতিও রয়েছে। আলপনায় দেবী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ ফুটিয়ে তোলা হয়, যা শুভাগমন ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

দেবী লক্ষ্মীকে ঘিরে বাংলার জনসমাজে বহু জনপ্রিয় ধর্মীয় কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এসব কাহিনি পাঁচালি আকারে সংকলিত হয়েছে, যা লক্ষ্মীপূজার দিন ভক্তরা পাঠ করেন। লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ পূজার একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। এর মাধ্যমে দেবীর মাহাত্ম্য, ধর্মীয় শিক্ষা এবং প্রচলিত লোকবিশ্বাস তুলে ধরা হয়।

Advertisements

‘কোজাগরী’ শব্দটির সঙ্গে জেগে থাকার ধারণা জড়িত। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘কে জাগরী’ অর্থাৎ ‘কে জেগে আছো’—এই প্রশ্ন থেকেই কোজাগরী নামের উৎপত্তি। ধর্মীয় বিশ্বাসে, আশ্বিনের পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী ভক্তদের গৃহে গৃহে পরিদর্শনে আসেন। যারা জেগে থেকে দেবীর আরাধনা করেন, তাদের প্রতি দেবী সন্তুষ্ট হন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই বিশ্বাসের কারণে কোজাগরী পূর্ণিমায় রাত্রি জাগরণের রীতি প্রচলিত হয়েছে। অনেকে রাতভর পূজা, প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার পালন করেন। তবে অঞ্চল ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী পূজার নিয়মে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজাকে ঘিরে বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ভক্তরা দেবীর প্রতিমা অথবা ঘটে পূজা করেন। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি ঘর সাজানো, আলপনা আঁকা, পাঁচালি পাঠ এবং নৈবেদ্য নিবেদনের আয়োজন থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পালিত এই উৎসবের মূল আকাঙ্ক্ষা হলো পরিবারে সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করা। দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা নতুন আশা ও মঙ্গলকামনায় কোজাগরী পূর্ণিমা উদ্‌যাপন করেন।

Advertisements