২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ৮ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি ইসলামে বৈধ?

A-30-6ac366c8f0365

শিশুদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা প্রকাশ করা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতির অংশ। ছোটদের কোলে নেওয়া, জড়িয়ে ধরা কিংবা কপালে চুমু দিয়ে আদর করা ভালোবাসা প্রকাশের পরিচিত মাধ্যম। ইসলামেও শিশুদের প্রতি দয়া, মমতা ও কোমল আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও শিশুদের স্নেহ করতেন এবং তাদের চুমু দিতেন। তবে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের সম্মান, স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া জায়েজ কি না, এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা জানতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণ ও হাদিসের শিক্ষা জানা প্রয়োজন।

শিশুদের চুমু দিতেন মহানবী (সা.)

শিশুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা ও মমতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত হাদিসে পাওয়া যায়। তিনি শিশুদের আদর করতেন, তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করতেন এবং চুমু দিতেন। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হাদিসে বলা হয়েছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস আত-তামিমি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, তাঁর দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি কখনো তাদের কাউকে চুমু দেননি।

তখন নবীজি (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন—

مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ

Advertisements

অর্থ: ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।’

হাদিসটি সহিহ বুখারি (৫৯৯৭) ও সহিহ মুসলিমে (২৩১৮) বর্ণিত হয়েছে।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করা ইসলামে প্রশংসনীয়। শিশুদের চুমু দেওয়া নিষিদ্ধ কোনো কাজ নয়; বরং এটি নবীজি (সা.)-এর আদর্শে দয়া ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।

শিশুদের প্রতি কঠোরতা নয়, স্নেহের শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি

শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা এবং তাদের প্রতি মমতা দেখানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সন্তানদের আদর করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানুষের হৃদয়ে থাকা দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, একবার এক বেদুইন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন? আমরা তো আমাদের সন্তানদের চুমু দিই না।

এর উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া-মমতা সরিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি কী করতে পারি?’

হাদিসটি সহিহ বুখারি (৫৯৯৮) ও সহিহ মুসলিমে (২৩১৭) বর্ণিত হয়েছে।

এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; তাদের মানসিক বিকাশের জন্যও ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন।

শিশুদের প্রতি দয়া ও সুন্দর আচরণে কোরআনের শিক্ষা

পবিত্র কোরআনে শিশুদের চুমু দেওয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, কোমলতা ও দয়া প্রদর্শনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

অর্থ: ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ৮৩)

অন্যদিকে সুরা আল-হিজরের ৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিনয় ও কোমল আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন।

কোরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক শিক্ষা হলো, মানুষের সঙ্গে সদয় আচরণ করা, দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং শিশুদের ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে বড় করে তোলা। তাই শিশুকে স্নেহের সঙ্গে জড়িয়ে ধরা বা কপালে চুমু দেওয়ার মতো স্বাভাবিক আচরণ ইসলামের দয়া ও মমতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যদি তা শালীনতা ও নিরাপত্তার সীমার মধ্যে থাকে।

নিজের সন্তান ছাড়াও অন্যের শিশুকে চুমু দেওয়া যাবে?

নিজের সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা পরিবারের ছোট সদস্যদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করা স্বাভাবিক ও বৈধ। অন্যের শিশুকে আদর করার ক্ষেত্রেও শিশুর বয়স, সম্পর্ক, পারিবারিক রীতি এবং শরিয়তের বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

১. অভিভাবকের সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়া: অন্যের শিশুকে কোলে নেওয়া বা চুমু দেওয়ার আগে তার মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করা উচিত। কোনো অভিভাবক আপত্তি জানালে তা সম্মান করতে হবে।

২. শিশুর ইচ্ছা ও স্বস্তি বজায় রাখা: শিশু কোনো ব্যক্তির কাছে যেতে না চাইলে, কোলে উঠতে অস্বস্তি বোধ করলে কিংবা চুমু দিতে নিষেধ করলে তাকে জোর করা উচিত নয়। আদর কখনো চাপ প্রয়োগের বিষয় হতে পারে না।

৩. বয়স ও মাহরাম-গায়রে মাহরামের বিধান মানা: শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরিয়তের পর্দা ও শারীরিক স্পর্শসংক্রান্ত বিধানগুলো বিবেচনায় নিতে হয়। বালেগ হওয়ার পর গায়রে মাহরামের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্ধারিত সীমা রক্ষা করা জরুরি। তবে বয়স, সম্পর্ক ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বিধানের বিস্তারিত ভিন্ন হতে পারে।

৪. স্নেহের নামে অনুচিত আচরণ না করা: চুমু বা স্পর্শের উদ্দেশ্য হতে হবে স্বাভাবিক স্নেহ ও মমতা। কোনো ধরনের কামনাপূর্ণ আচরণ, যৌন উদ্দেশ্যে স্পর্শ কিংবা শিশুর মর্যাদাহানিকর কাজ গ্রহণযোগ্য নয়।

শিশুদের নিরাপত্তা ও শারীরিক সীমানা রক্ষা কেন জরুরি?

শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড়দের দায়িত্ব। ইসলাম মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই শিশুকে আদর করার নামে তার ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

শিশুর শরীরের ব্যক্তিগত অংশ সম্পর্কে বয়স উপযোগী ভাষায় তাকে সচেতন করা প্রয়োজন। তাকে বোঝাতে হবে, কেউ কোনো স্পর্শে অস্বস্তি সৃষ্টি করলে সে ‘না’ বলতে পারে এবং বিশ্বস্ত অভিভাবককে বিষয়টি জানাতে পারে। সাধারণত শরীরের যেসব অংশ অন্তর্বাস দিয়ে ঢাকা থাকে, সেগুলোর ব্যক্তিগত সীমানা সম্পর্কে শিশুকে সহজভাবে শেখানো যেতে পারে।

একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকা উচিত, যেন শিশু ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। কোনো শিশু অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের কথা জানালে তাকে দোষারোপ না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক স্নেহপূর্ণ আচরণকে প্রমাণ ছাড়া অপকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। আবার আদরের অজুহাতে কোনো অনুচিত আচরণ ঘটলে সেটিকে অবহেলা করাও উচিত নয়। শিশুর বক্তব্য, স্বস্তি ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুদের চুমু দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের মূল শিক্ষা কী?

হাদিসের আলোকে বলা যায়, শিশুদের আদর করা, চুমু দেওয়া এবং তাদের প্রতি মমতা প্রকাশ করা জায়েজ। মহানবী (সা.) নিজে তাঁর নাতি হাসান (রা.)-কে চুমু দিয়ে শিশুদের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো মানুষের প্রতি দয়া ও কোমলতার গুরুত্বও তুলে ধরে।

তবে এই অনুমতির অর্থ এই নয় যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে বা শিশুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে স্পর্শ করা যাবে। শিশুর বয়স, সম্পর্ক, শালীনতা, ব্যক্তিগত সীমা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।

সন্তানদের ভালোবাসা দেওয়া, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, আদর করা এবং মানসিকভাবে নিরাপদ পরিবেশে বড় হতে সাহায্য করা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামি শিক্ষার আলোকে প্রকৃত স্নেহ হলো এমন ভালোবাসা, যেখানে দয়া ও মমতার পাশাপাশি শিশুর মর্যাদা, স্বস্তি এবং সুরক্ষাও সমানভাবে গুরুত্ব পায়।

অতএব, শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া ইসলামে বৈধ এবং নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহসম্মত ভালোবাসার একটি দৃষ্টান্ত। এই ভালোবাসা প্রকাশের সময় শালীনতা বজায় রাখা, শিশুর অনিচ্ছাকে সম্মান করা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হলো ইসলামের দয়া ও উত্তম আচরণের শিক্ষার যথাযথ অনুসরণ।

Advertisements