২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ৮ কার্তিক ১৪৩৩
বিশ্ব

বিশ্বের একমাত্র খাদ্যস্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ, কীভাবে সম্ভব?

IMG_6871

দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ গায়ানা। আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনীতির কারণে দেশটি বিশ্বজুড়ে খুব বেশি আলোচিত না হলেও খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে রয়েছে এর বিশেষ পরিচিতি। ১৮৬টি দেশের খাদ্য উৎপাদন বিশ্লেষণ করে করা এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাতটি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর সব কটিতেই নিজস্ব উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে একমাত্র গায়ানার।

ফলমূল, শাকসবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম ও বীজ এবং চাল-আলুর মতো শর্করাজাতীয় খাবার—এই সাতটি খাদ্যগোষ্ঠীকে গবেষণায় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব খাদ্যগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে নিজস্ব উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সক্ষমতা গায়ানাকে অন্য দেশগুলোর তুলনায় আলাদা করেছে।

অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটি

গায়ানার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পেছনে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে সারা বছর উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং কৃষিকাজের উপযোগী জমি বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করেছে।

দেশটির কৃষকেরা একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের পদ্ধতিও ব্যবহার করেন। কৃষির এই কৌশলকে বলা হয় মিশ্র চাষ। যেমন নারকেলগাছের ফাঁকে আনারস বা টমেটো চাষ করা কিংবা ভুট্টার সঙ্গে সয়াবিন উৎপাদন করা। জমির কার্যকর ব্যবহার এবং ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াতে এ ধরনের চাষাবাদ সহায়ক হতে পারে।

এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে কৃষিকাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফসল উৎপাদনের সঙ্গে পশুপালন যুক্ত করা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার মতো পদ্ধতি কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বে ভূমিকা রাখতে পারে। পুনরুৎপাদনশীল কৃষি বা ‘রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতির লক্ষ্য মাটির স্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

Advertisements

কম জনসংখ্যাও বড় সুবিধা

গায়ানার খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটির তুলনামূলক কম জনসংখ্যা। জনসংখ্যা কম হলে খাদ্যের মোট চাহিদাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে উৎপাদিত খাদ্য দিয়ে দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটানো সহজ হতে পারে।

তবে শুধু জনসংখ্যা কম হলেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া যায় না। কৃষিজমির পরিমাণ, উৎপাদনব্যবস্থা, প্রযুক্তি, খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কোনো দেশে সাতটি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই যে সব অঞ্চলের সব মানুষ সব সময় পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কেন অন্য দেশগুলোকে খাদ্য আমদানি করতে হয়?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নিজেদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের খাদ্য উৎপাদন করতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

প্রথমত, সব দেশের জলবায়ু ও মাটির ধরন এক নয়। কোথাও তীব্র শীত, কোথাও অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়া, আবার কোথাও পানির সংকটের কারণে নির্দিষ্ট কিছু ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, অনেক দেশের তুলনায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কম। নগরায়ণ, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে দেশের সব ধরনের খাদ্য নিজস্ব জমিতে উৎপাদন করা কঠিন হয়ে উঠছে।

তৃতীয়ত, বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতে অনেক দেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে যেসব দেশে কৃষিজমি সীমিত কিংবা উৎপাদন খরচ বেশি, তাদের জন্য বিদেশ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করা অনেক সময় প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে অনেক দেশ নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য উৎপাদনে বিশেষায়িত হয়। কোনো দেশ যে পণ্য কম খরচে বেশি উৎপাদন করতে পারে, সেটি রপ্তানি করে অন্য খাদ্য আমদানি করতে পারে। এতে উৎপাদন ও বাণিজ্যের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?

গায়ানার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্যও কিছু শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সীমিত জমিতে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো, একই জমির কার্যকর ব্যবহার, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

পাশাপাশি উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, ফসলের অপচয় কমানো এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি সারা বছর মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়াও সমান জরুরি।

সব মিলিয়ে, অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষির কার্যকর ব্যবহার এবং তুলনামূলক কম খাদ্যচাহিদা গায়ানার খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। জনসংখ্যা, জলবায়ু, উৎপাদন খরচ ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলালে একটি দেশের খাদ্যনির্ভরতার চিত্রও পাল্টে যেতে পারে।

Advertisements