২২ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৬ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলাদেশ

চাষের মাছেও মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে জলজ পরিবেশ

IMG_6549

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরেও পাওয়া গেছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি মাছের খামারের পুকুরের তলদেশের পলিতে এসব অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। একই সঙ্গে ছয় প্রজাতির মাছের পরিপাকতন্ত্রেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর মধ্যে পাঙাশ ও রুই মাছে দূষণের উপস্থিতির হার তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট-ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্কস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণার জন্য ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের খামার থেকে পুকুরের তলদেশের পলি এবং রুই, কাতলা, পাঙাশ, মৃগেল, কমন কার্প ও সরপুঁটি—এই ছয় প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি প্রজাতি থেকে ২৫টি করে মোট ১৫০টি মাছের নমুনা রাসায়নিক ও অণুবীক্ষণিক বিশ্লেষণ করা হয়।

বিশ্লেষণে মাছের পরিপাকতন্ত্রে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে কণার সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৬০টি। প্রজাতিভেদে এসব কণা গ্রহণের হারে পার্থক্য দেখা গেছে। সরপুঁটিতে গড়ে প্রতি মাছে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। রুই ও কালিবাউশের ক্ষেত্রে এ হার ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৬৮টি করে।

অন্যদিকে, পরীক্ষা করা ২৫টি পুকুরের সব কটির তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা।

Advertisements

পাঙাশ ও রুইয়ে দূষণের উপস্থিতি বেশি

গবেষণায় প্রজাতিভেদে মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। পাঙাশের ৪০ শতাংশ এবং রুইয়ের ৩৬ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। কাতলা ও মৃগেলের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ২০ শতাংশ করে। কমন কার্প ও সরপুঁটির ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে ১৬ শতাংশ হারে।

মাছের বসবাসের স্তর ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক দেখা গেছে। পুকুরের তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার ছিল ৫২ শতাংশ। মধ্যস্তরে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে এ হার ৩৫ শতাংশ এবং পানির উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।

খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে সর্বভুক মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার ছিল ৫৮ শতাংশ। তৃণভোজী মাছের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ।

মাছের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নে ফাল্টনের কন্ডিশন ফ্যাক্টর বা কে-মানও বিশ্লেষণ করা হয়। সরপুঁটির ক্ষেত্রে এ মান সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২৭ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, কাতলা ও পাঙাশের ক্ষেত্রে মান ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩৫ ও শূন্য দশমিক ৩৭। তবে এসব পরিসংখ্যান থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিকই মাছের শারীরিক অবস্থার পার্থক্যের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

পুকুরের তলদেশে জমছে প্লাস্টিক কণা

গবেষণায় পুকুরের পলিতে দূষণের মাত্রা নির্ণয়ে পলিউশন লোড ইনডেক্স বা পিএলআই ব্যবহার করা হয়। নমুনাগুলোতে এ সূচকের মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫। কয়েকটি নমুনায় দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষকদের মতে, পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি আধার হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব কণা পলি থেকে মাছের খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে তাদের পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।

পলির নমুনায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পলিইথিলিন, যার পরিমাণ ৩৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, ২৭ শতাংশ।

মাছের পরিপাকতন্ত্রে শনাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণেও বিভিন্ন ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পলিপ্রোপিলিন ২৪ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ, পলিকার্বনেট ১৯ শতাংশ, সেলুলোজ অ্যাসিটেট ১৫ শতাংশ, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ১৩ শতাংশ এবং পলিইথিলিন ৮ শতাংশ।

মাছের খাদ্য ও চাষের সরঞ্জাম হতে পারে উৎস

গবেষকদের বিশ্লেষণে মাছের খাদ্যের প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিং, মাছ ধরার নাইলন ও পলিয়েস্টারের জাল, পুকুরের পাড়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ত্রিপল এবং সেচকাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপের ক্ষয়কে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহারের সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। পরে তা পুকুরের পানি ও তলদেশের পলিতে জমা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকে খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এসব কণা।

মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়

গবেষণার ফলাফল মাছ চাষের পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করলেও মানুষের স্বাস্থ্যে এর প্রভাব সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খান জানান, গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। ফলে এসব মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে কিংবা এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী হতে পারে, তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তিনি ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাব পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেন।

পাশাপাশি মাছের খামারে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগ, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার, পুকুরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার এবং পুকুরের পানি ও পলির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।

গবেষণাটি বাংলাদেশের মাছ চাষের পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের উপস্থিতি তুলে ধরেছে। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং মাছ চাষের পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে জলজ পরিবেশের সুরক্ষা ও নিরাপদ মাছ উৎপাদনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisements