২২ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৬ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলাদেশ

একা পথ চলাতেই আনন্দ, নিজেকে খুঁজতে সোলো ট্রাভেলে ঝুঁকছেন বাংলাদেশিরা

IMG_6538

ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ আর মানসিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে একাকী ভ্রমণের দিকে ঝুঁকছেন বাংলাদেশের অনেক মানুষ। দলবেঁধে ঘোরার বদলে নিজের পছন্দ, সময় ও পরিকল্পনা অনুযায়ী অচেনা জায়গা ঘুরে দেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করছে এই ভ্রমণধারা। বিশেষ করে মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে বাড়ছে ‘সোলো ট্রাভেল’ বা একাকী ভ্রমণের জনপ্রিয়তা।

গুগল ট্রেন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ‘সোলো ট্রাভেল’ নিয়ে মানুষের অনুসন্ধানের আগ্রহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মি-মুনিং’ ধারণা। হানিমুন শব্দ থেকে অনুপ্রাণিত এই পরিভাষার অর্থ নিজের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে ছুটিতে বেরিয়ে পড়া। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে মানসিক প্রশান্তি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা উপভোগ করতেই অনেকে বেছে নিচ্ছেন এমন ভ্রমণ।

একা ভ্রমণ, সঙ্গীও মিলছে পথে

একাকী ভ্রমণ মানেই যে পুরোপুরি একা থাকা, তা নয়। নিজের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রেখে ভ্রমণের সুযোগ পেতে অনেকেই অপরিচিত মানুষদের নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন গ্রুপ ট্যুরে অংশ নিচ্ছেন।

মেঘদূত ট্যুরিজমের প্রধান নির্বাহী খন্দকার জহিরুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বাংলাদেশে একাকী ভ্রমণের প্রবণতা অনেক আগে থেকেই রয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, একাকী ভ্রমণকারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত চাকরিজীবী। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময়সূচি মেলাতে না পারায় তাঁরা একাই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের অনেকে সংগঠিত গ্রুপ ট্যুরে অংশ নিলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে আলাদা কক্ষ পছন্দ করেন। এ জন্য অতিরিক্ত খরচ করতেও তাঁদের আপত্তি নেই।

Advertisements

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা ও ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত পেশাজীবীদের মধ্যে এ ধরনের ভ্রমণের চাহিদা রয়েছে। মানসিক প্রশান্তি অর্জন, কাজের প্রয়োজনে নিরিবিলি সময় কাটানো কিংবা সাইক্লিংয়ের মতো বাইরের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে তাঁরা ভ্রমণ করেন। জনপ্রিয় রুটের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি এবং রাঙামাটি-বান্দরবান। একটি সাইক্লিং দল বছরে তিন থেকে চারবারও ভ্রমণের আয়োজন করে।

পরিকল্পনা ভাঙলেও থেমে থাকেন না তাঁরা

ব্র্যাক আইটির বিজনেস সিস্টেম অ্যানালিস্ট শামসুন্নাহার লিপির একাকী ভ্রমণের শুরুটা হয়েছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে। তাঁর এক ভ্রমণসঙ্গী পূর্বপরিকল্পিত সফর বাতিল করে দিলে তিনি একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই যাত্রা তাঁকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয় এবং পরবর্তী সময়ে আরও ভ্রমণে উৎসাহিত করে।

লিপির মতে, দলবদ্ধ ভ্রমণে সব সময় সম্ভব হয় না এমন অনেক অভিজ্ঞতা একা ভ্রমণে পাওয়া যায়। নতুন মানুষ ও অচেনা জায়গার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাঁকে আকৃষ্ট করে। তাঁর ভাষায়, বড় কোনো একাকী ভ্রমণ শেষে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সাহস নিয়ে ফিরে আসে। তবে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলাতে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও মানসিক নমনীয়তা জরুরি।

মেটলাইফ বাংলাদেশের ব্যাংকঅ্যাসুরেন্স সেলস সাপোর্ট অফিসার শিফাত রহমান সুস্ময়ের একাকী ভ্রমণের আগ্রহের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন সমাজ ও সম্প্রদায়কে জানার কৌতূহল। পরিচিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে, তা বুঝতে চান তিনি। দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তার উদ্বেগ থাকলেও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সচেতন করেছে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছে।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ভিডিও এডিটর সুমিত মজুমদারের কাছে একাকী ভ্রমণ দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির উপায়। কাজ, ঘুম আর একই রুটিনের পুনরাবৃত্তিতে ক্লান্ত হয়ে তিনি ভিন্ন অভিজ্ঞতার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। একবার ট্রেন মিস করার পর নিজেকেই বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছিল তাঁকে। এমন অভিজ্ঞতা তাঁকে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে শিখিয়েছে। নিজের মতো করে পরিকল্পনা করা এবং পথে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান করার স্বাধীনতাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুয়াজ আব্দুর রহিম ইতিমধ্যে ১৩টি দেশ এবং বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। তাঁর মতে, একাকী ভ্রমণের জন্য সাহস ও সহনশীলতা প্রয়োজন। এতে খরচ ভাগাভাগি করার সুযোগ না থাকায় ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে নিজের সময়সূচি অনুযায়ী চলার স্বাধীনতা সেই অভিজ্ঞতাকে বিশেষ করে তোলে। তাঁর ভাষায়, একা ভ্রমণ মনকে শান্ত ও সতেজ করে এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

কোন বিভাগে আগ্রহ বেশি?

গুগল ট্রেন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ‘সোলো ট্রাভেল’ নিয়ে অনুসন্ধানের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি খুলনা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগেও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখা গেছে।

তবে গুগল ট্রেন্ডসের শূন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কেল প্রকৃত ভ্রমণকারীর সংখ্যা নির্দেশ করে না; বরং নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার তুলনামূলক অনুসন্ধান-আগ্রহ তুলে ধরে। ফলে এই তথ্য একাকী ভ্রমণ নিয়ে মানুষের কৌতূহল বোঝালেও বাস্তবে কতজন এ ধরনের ভ্রমণ করছেন, তা নিশ্চিত করে না।

একাকী পর্যটকদের জন্য কতটা প্রস্তুত পর্যটন খাত?

একাকী ভ্রমণের জনপ্রিয়তা বাড়লেও পর্যটন খাতে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করার প্রশ্ন রয়েছে। অনেক হোটেলে দুজনের থাকার উপযোগী কক্ষের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। আবার রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোর সেবাও অনেক সময় দম্পতি বা দলকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়। ফলে একা ভ্রমণকারীদের ব্যক্তিগত পরিসর নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একক পর্যটকদের জন্য উপযোগী আবাসন, নমনীয় মূল্য নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা চালু করা গেলে এই বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘সোলো ইকোনমি’

একাকী ভ্রমণের পাশাপাশি একা থাকা, খাওয়া ও ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের ভোক্তাবাজার, যা ‘সোলো ইকোনমি’ নামে পরিচিত।

হিলটন হোটেলস একা আসা অতিথিদের উপযোগী আসন ও খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হনজোক’ সংস্কৃতিতে একা সময় কাটানোকে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাপানের ইচিরান রামেন রেস্তোরাঁয় একা বসে খাওয়ার জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত বুথ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনি থিম পার্কগুলোতে একা আসা দর্শনার্থীদের জন্য কিছু রাইডে অপেক্ষার সময় কমাতে আলাদা লাইনের ব্যবস্থা রয়েছে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও ফোর্বসের প্রতিবেদনেও একক ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্ব উঠে এসেছে। এই বাজারের চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভোক্তার ব্যয়ের ধরনও বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী একাকী ভ্রমণের বাজার ২০২৫ সালের ৪৮৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩১ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশেও একাকী ভ্রমণের জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তবে এই প্রবণতা কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো একক ভ্রমণকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা কতটা উন্নত করতে পারে এবং সমাজে একা ভ্রমণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ইতিবাচক হয় তার ওপর। নিজের মতো করে পৃথিবীকে দেখা, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজেকে নতুনভাবে চেনার সুযোগ—সব মিলিয়ে সোলো ট্রাভেল এখন কেবল ঘোরাঘুরি নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানসিক প্রশান্তি খোঁজারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে।

Advertisements