আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে সুন্দরবনের সাতটি জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স

সুন্দরবনের পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির জিনগত তথ্য যুক্ত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গবেষণায় বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার। সুন্দরবনের নদী ও খালে পাওয়া পাঁচ প্রজাতির মাছ এবং দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে। এর মাধ্যমে সুন্দরবনের জলজ সম্পদের জিনগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে বৈশ্বিক গবেষণার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অনুষ্ঠানে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বন বিভাগের মাধ্যমে সাতটি প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে জমা দেওয়া হবে।
‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ১৬ মাসব্যাপী গবেষণার মাধ্যমে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। সম্প্রতি খুলনায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার প্রাথমিক তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
বিস্তৃত জরিপে উঠে এসেছে জলজ সম্পদের চিত্র
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খাল জরিপ করেন গবেষকেরা। পাশাপাশি বনের ভেতরে প্রায় ৪২৪ কিলোমিটার নৌপথে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার আওতা আরও বিস্তৃত করতে শ্যামনগর, কয়রা, মোংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকেও তথ্য নেওয়া হয়। গবেষক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক জানান, গবেষণা শেষে পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি বন বিভাগের অধীন হওয়ায় প্রথমে প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর সরকারি উদ্যোগে ডেটাবেজে এসব তথ্য যুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
আগেও যুক্ত হয়েছে ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ
সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর জিনগত তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ড. এনামুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত হয়েছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় এবং বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই গবেষণা পরিচালনা করে। নতুন সাতটি প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স যুক্ত হলে সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্যের জিনগত তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে প্রজাতি শনাক্তকরণ, জিনগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা জলজ প্রাণীর সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
সংরক্ষণে গুরুত্ব পাচ্ছে সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ
সুন্দরবনের নদী, খাল ও জলাভূমি অসংখ্য মাছ, চিংড়ি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এসব প্রজাতি বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ড. এনামুল হক মনে করেন, সুন্দরবনের উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং কার্যকর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এখানকার জলজ সম্পদ আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ, আবাসস্থল রক্ষা এবং প্রাকৃতিক প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সুন্দরবনের সাতটি জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ তাই শুধু তথ্য সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনন্য এই ম্যানগ্রোভ বনকে সুরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাতটি প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।



