যুদ্ধ, খরা ও জ্বালানির চাপে খাদ্যবাজার, ২০২৭ সালেও ভোগাতে পারে মূল্যবৃদ্ধি

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর কারণে খরার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বাড়ছে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আগামী কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে। এমনকি এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা ২০২৭ সালজুড়েও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের দরিদ্র পরিবারগুলো। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশে আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করতে হয়। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে। চলতি বছরের শেষ ভাগ থেকে আগামী বছরের শুরু এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালজুড়েই এর প্রভাব অনুভূত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে, এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
যুদ্ধের আঁচ খাদ্যবাজারে
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাণিজ্যপথে নিরাপত্তাঝুঁকি খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবও পড়েছে জ্বালানি ও সারবাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিতে বিঘ্নের কারণে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা বেশি দামে সার ও জ্বালানি কিনতে বাধ্য হলে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের দামে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর কারণে শুষ্ক আবহাওয়ার ঝুঁকি। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ফলে বাজারে খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গম, চাল, তেল—সবখানেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠলেও পরে কিছুটা কমেছে; তবে তা এখনো তুলনামূলক বেশি। খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় একটি পাউরুটির দাম জুলাই মাসে চার মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও চলতি বছরে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
ভারতেও উৎপাদন ঘাটতির প্রভাবে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
শুধু খাদ্যপণ্য নয়, পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু আন্তর্জাতিক নৌপথে, বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত ব্যয় এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন একটি বাস্তব সমস্যা।
মজুত কমলেই বাড়তে পারে নতুন চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে শুধু যুদ্ধ বা উৎপাদন ঘাটতিই নয়, আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ভালো ফলনের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় মজুত কমে এলে তাদের আবার আমদানির দিকে ফিরতে হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে শস্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভের মতে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারক দেশগুলো আবার বাজারে সক্রিয় হলে চাহিদায় বড় ধরনের নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরেরোও মনে করেন, আগের মৌসুমগুলোতে ভালো ফলন ও বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুরক্ষা ক্রমেই চাপে পড়ছে। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হলে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকি বেশি
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু ভোক্তা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাঁচামাল, পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। ফলে নতুন চুক্তি করার সময় আগের তুলনায় বেশি দাম দিতে হচ্ছে। যেসব দেশের মুদ্রার মান কমে যাচ্ছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলারে পণ্য কিনতে গিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং জানিয়েছেন, জাহাজভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটির মুদ্রা রুপিয়াহর দর কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আমদানির ওপর নির্ভরতা, মুদ্রার বিনিময় হার, সরকারি নীতি এবং সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশ্ব খাদ্যবাজারের সামনে এখন একাধিক অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিবহন ও জ্বালানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে। খরা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একই সময়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলো বাজারে ফিরে এলে চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে। এসব ঝুঁকি একসঙ্গে বাস্তব রূপ নিলে খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তেই থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবহাওয়া, উৎপাদন, শস্যের মজুত, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভর করে বাজারের গতিপথ বদলাতে পারে। আপাতত বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো—বিশ্ব খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে, আর এর প্রভাব আগামী বছরেও অনুভূত হতে পারে।



