সর্দি-কাশি থেকে বাঁচতে ভিটামিন সি, কতটা উপকার পাবেন?

শীতের আবহাওয়া শুরু হলে সর্দি-কাশি থেকে দূরে থাকতে অনেকেই ভিটামিন সি খাওয়ার দিকে ঝোঁকেন। কেউ নিয়মিত ফলমূল খান, আবার কেউ দ্রুত সুস্থ থাকার আশায় ফার্মেসি থেকে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট কিনে নেন। প্রচলিত ধারণা হলো, এই ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে। তবে ভিটামিন সি কি সত্যিই সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করতে পারে, নাকি অসুস্থতার সময় এর কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের ধারণা কিছুটা অতিরঞ্জিত?

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি সর্দি-কাশি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না। নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সর্দির স্থায়িত্ব সামান্য কমতে পারে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যায় না। তাই সর্দি-কাশি এড়ানোর একমাত্র উপায় হিসেবে এই ভিটামিনের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
ভিটামিন সি নিয়ে এই ধারণার শুরু কোথা থেকে?
সর্দি-কাশি প্রতিরোধে ভিটামিন সি ব্যবহারের ধারণাটি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মার্কিন রসায়নবিদ লিনুস পোলিংয়ের। তিনি ১৯৫৪ সালে রসায়নে এবং ১৯৬২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে ভিটামিন সি গ্রহণের মাধ্যমে সর্দি প্রতিরোধ ও এর উপসর্গ কমানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
পোলিংয়ের লেখায় প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ২ হাজার মিলিগ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। এরপর সর্দি-কাশি প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণের কিছু সম্ভাব্য উপকার থাকলেও এটি সর্দি প্রতিরোধের নিশ্চিত পদ্ধতি নয়। ফলে পোলিংয়ের সময়কার প্রচলিত ধারণার সবকিছু আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সঙ্গে মেলে না।
নিয়মিত ভিটামিন সি খেলে কি সর্দি হওয়ার ঝুঁকি কমে?
এ বিষয়ে গবেষণার ফলাফল বেশ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে সর্দি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, প্রতিদিন ভিটামিন সি খেলেই যে ঠান্ডা লাগবে না বা সর্দি-কাশি হবে না, তা নয়। ভাইরাসের সংস্পর্শ, ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা, ঘুম, পুষ্টি ও অন্যান্য বিষয় সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
তবে বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ভিন্ন ফল দেখা গেছে। যাঁরা অল্প সময়ে প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম করেন, যেমন কিছু ক্রীড়াবিদ বা অত্যন্ত শীতল পরিবেশে কঠোর প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ সর্দি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সর্দি হলে ভিটামিন সি কতটা উপকার করে?
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্দির স্থায়িত্ব কিছুটা কমতে পারে। বিভিন্ন গবেষণার সম্মিলিত ফলাফল অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সর্দির স্থায়িত্ব গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ শতাংশ কমতে পারে। তবে ফলাফল ব্যক্তি ও গবেষণাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
সহজভাবে বললে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সর্দি সাত দিন স্থায়ী হলে নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণের ফলে গড়ে কয়েক ঘণ্টা থেকে প্রায় অর্ধদিন পর্যন্ত সময় কমতে পারে। তবে এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়; কারও ক্ষেত্রে উপকার নাও দেখা যেতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সর্দি শুরু হওয়ার পর ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শুরু করলে অসুস্থতার স্থায়িত্ব বা তীব্রতা কমে—এমন ধারাবাহিক প্রমাণ নেই। গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের বিষয়টি মূলত নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা অসুস্থ হওয়ার আগেই শুরু করা হয়।
তাই সর্দি-কাশি দেখা দেওয়ার পর বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি খেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন, এমন ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
প্রতিদিন কতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন?
ভিটামিন সি শরীরের জন্য অপরিহার্য একটি পুষ্টি উপাদান। এটি কোলাজেন তৈরিতে, ক্ষত সারাতে, উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তবে শরীরের প্রয়োজন মেটাতে সবার উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার দরকার হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রায় ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন। ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও বেশি হতে পারে। গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান এবং বয়স অনুযায়ী চাহিদারও পরিবর্তন হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য খাবার ও সাপ্লিমেন্ট মিলিয়ে দৈনিক ভিটামিন সি গ্রহণের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ২ হাজার মিলিগ্রাম। এটি প্রয়োজনীয় দৈনিক পরিমাণ নয়; বরং সাধারণভাবে এর বেশি গ্রহণ না করার একটি সীমা। চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ ছাড়া এত উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।
অতিরিক্ত ভিটামিন সি খেলে কী সমস্যা হতে পারে?
ভিটামিন সি পানিতে দ্রবণীয় হওয়ায় শরীর অতিরিক্ত অংশের কিছুটা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলেও কোনো ক্ষতি হবে না। বিশেষ করে সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণ করলে নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণের কারণে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, পেট ফাঁপা ও অস্বস্তি হতে পারে। যাঁদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কিছু পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণ কিডনিতে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া শরীরে আয়রন জমে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত ভিটামিন সি ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, এই ভিটামিন খাবার থেকে আয়রন শোষণ বাড়ায়। কিছু চিকিৎসা ও ওষুধের সঙ্গে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্টের পারস্পরিক প্রভাবও থাকতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকলে কিংবা নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
প্রাকৃতিক খাবার থেকে ভিটামিন সি পাওয়ার উপায়
শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পেতে প্রতিদিনের খাবারে ফলমূল ও শাকসবজি রাখা ভালো। কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, আমলকী, পেঁপে, লেবু, টমেটো এবং বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাকসবজিতে এই ভিটামিন পাওয়া যায়।
বিশেষ করে পেয়ারা ও আমলকী ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। তাই শুধু সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী। তবে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খেলেও সর্দি-কাশি কখনোই হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সর্দি-কাশি হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি পান এবং উপসর্গ অনুযায়ী পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।



