চট্টগ্রামের যে পূজামণ্ডপ দেখতে উপচে পড়ছে মানুষের ঢল!

কৃত্রিম কুয়াশার আবহ, নীল লেজার আলোর বিচিত্র খেলা আর মেটালে নির্মিত দুর্গা প্রতিমা—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলীর ঐতিহাসিক বাণী মন্দিরের দুর্গাপূজা। ষষ্ঠী থেকেই মণ্ডপটিতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে মণ্ডপের ছবি ও ভিডিও। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও মানুষ আসছেন এই আয়োজন দেখতে।
দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে প্রতিদিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আয়োজকদের। মণ্ডপে প্রবেশের জন্য দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি আশপাশের সড়কেও তৈরি হচ্ছে যানজট। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে প্রতিমা দর্শন করতে হচ্ছে। তবু দর্শনার্থীদের আগ্রহে ভাটা পড়ছে না।
ছয় রিপুর বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক লড়াই
বাণী মন্দিরে এবার আয়োজন করা হয়েছে ৫৮তম দুর্গাপূজার। সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদযাপন পরিষদের এবারের প্রতিপাদ্য ‘রিপু রজনী’। মানুষের অন্তর্গত ছয়টি রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক সংগ্রামের ভাবনা থেকেই সাজানো হয়েছে পুরো আয়োজন। প্রচলিত প্রতিমা নির্মাণের উপকরণের পরিবর্তে মেটাল ব্যবহার এ বছরের আয়োজনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন অপটিমিস্টিক দে। আর দুর্গা প্রতিমার কারুকাজ করেছেন শিল্পী কার্তিক পাল। আলোকসজ্জার দায়িত্বে থাকা ‘কৈলাশ লাইটিং’-এর ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম কুয়াশা ও নীল লেজার আলো মণ্ডপে তৈরি করেছে ভিন্নধর্মী পরিবেশ। শিল্প, প্রযুক্তি ও ধর্মীয় ভাবনার সমন্বয়ে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা।
বাণী মন্দিরের সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদযাপন পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা জুয়েল শীল বলেন, ‘আমরা সমসাময়িক শিল্প ও প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি গভীর দার্শনিক বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছি।’ তিনি জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। ব্যাপক এই সাড়া পূজার ৫৮তম বার্ষিকীকে স্মরণীয় করে তুলেছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, তবু আগ্রহে ভাটা নেই
মণ্ডপের আকর্ষণ দেখতে আসা দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। সপ্তমীর রাতে মণ্ডপে আসা সোমা দে জানান, প্রতিমা দর্শনের সুযোগ পেতে তাঁকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সোমা দের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, আয়োজনটি দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ কতটা বেশি। তবে বিপুল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
আয়োজকদের অভিযোগ, দর্শনার্থীদের চাপের তুলনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা পর্যাপ্ত নয়। জুয়েল শীল বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো মানুষ এলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভিড় সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়নি। তিনি জানান, পুলিশ বিভাগের কাছে ২০ জন সদস্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মণ্ডপে দায়িত্ব পালন করছেন দুজন পুলিশ সদস্য ও পাঁচজন আনসার সদস্য। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম নিয়ন্ত্রণে এই জনবল যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন।
ভিড় নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পশ্চিম জোনের উপকমিশনার আলমগীর হোসেন বলেন, ব্যতিক্রমী থিমের কারণে মণ্ডপে মানুষের সমাগম বেড়েছে। তিনি জানান, কলকাতায় পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে প্রাণহানির ঘটনার পর সরকার পূজার ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, আয়োজকেরা বারবার পুলিশ সদস্য বাড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছেন এবং আগের দিনও তাঁদের ফোন পেয়ে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। এদিকে চট্টগ্রামে দুর্গাপূজাকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার ১৬টি উপজেলায় মোট ২ হাজার ৫৬৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন করে প্রায় ৪০০টি মণ্ডপ যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া জানান, উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১২ হাজার আনসার সদস্য এবং পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, গুজব, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টহল এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা কার্যক্রমও চলছে।
উৎসবের আনন্দের সঙ্গে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
উত্তর কাট্টলীর বাণী মন্দিরের এবারের আয়োজন শিল্পভাবনা ও প্রযুক্তির অভিনব ব্যবহারের কারণে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিমার নির্মাণশৈলী থেকে আলোকসজ্জা—সবকিছুই দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। তবে বিপুল জনসমাগমের মধ্যে নিরাপদে প্রতিমা দর্শনের সুযোগ নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। উৎসবের আনন্দ যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ম্লান না হয়, সে জন্য আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। দর্শনার্থীদেরও ধৈর্য ধরে সারিবদ্ধভাবে চলাচল এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
সব মিলিয়ে ‘রিপু রজনী’ থিমের বাণী মন্দির এবার শুধু প্রতিমা দর্শনের আকর্ষণেই নয়, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে গভীর বার্তার কারণেও আলোচনায় এসেছে। তবে এই আয়োজনের সাফল্য পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন দর্শনার্থীরা ভিড়ের ভোগান্তি ছাড়াই নিরাপদে উৎসব উপভোগ করতে পারবেন।



