ইনকিউবেটরের ভেতর দুই জমজ বোনের ভালোবাসা

১৯৯৫ সালের অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের উস্টার শহরের একটি হাসপাতালে জন্ম নেয় যমজ দুই বোন ব্রিয়েল ও কাইরি জ্যাকসন। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১২ সপ্তাহ আগেই পৃথিবীতে আসে তারা। জন্মের সময় দুজনের ওজনই ছিল প্রায় ৯০০ গ্রাম। অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়ায় তাদের রাখা হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণে।
প্রথমদিকে কাইরির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও ব্রিয়েলের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। শিশুটির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছিল। চিকিৎসাকর্মীরা নানা চেষ্টা করেও তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন নার্স গেইল ক্যাসপারিয়ান। তাঁর মনে পড়ে, ইউরোপের কিছু অঞ্চলে অপরিণত যমজ শিশুদের একই বিছানায় রাখার প্রচলন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তখন এই পদ্ধতি খুব একটা পরিচিত ছিল না। তবু শিশুটির অবস্থা বিবেচনা করে তিনি বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে ব্রিয়েলকে তার বোন কাইরির ইনকিউবেটরে রাখেন।
জন্মের পর প্রথমবারের মতো দুই বোন আবার পাশাপাশি থাকার সুযোগ পায়। এরপর ঘটে এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। ব্রিয়েল তার বোনের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাইরি নিজের ছোট্ট একটি হাত বাড়িয়ে ব্রিয়েলের শরীরের ওপর রাখে। দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন অসুস্থ বোনটিকে আলিঙ্গন করছে। নার্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এরপর ব্রিয়েলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি দেখা যায়। তার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে এবং হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের দিকে ফিরতে থাকে।
এই অসাধারণ মুহূর্তের একটি ছবি তুলে রাখেন একজন আলোকচিত্রী। পরে ছবিটি ‘দ্য রেসকিউয়িং হাগ’ বা ‘জীবন বাঁচানো আলিঙ্গন’ নামে পরিচিতি পায়। ছবিটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, মমতা ও পারস্পরিক সান্নিধ্যের শক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। তবে শুধু আলিঙ্গনের কারণেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
শেষ পর্যন্ত ব্রিয়েল ও কাইরি দুজনই সুস্থ হয়ে ওঠে। তাদের গল্প আজও মানুষের মনে জায়গা করে আছে দুই ছোট্ট শিশুর এক হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তের স্মৃতি হিসেবে।
কখনো কখনো একটি ছোট্ট স্পর্শও মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ব্রিয়েল ও কাইরির গল্প সেই অনুভূতিকেই মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসার প্রকাশ ছোট হতে পারে, কিন্তু তার আবেগময় আবেদন অনেক বড়।



