১৪ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

সেগুনবাগিচার দেয়ালে নতুন রূপে বেগম রোকেয়া, জসীমউদ্‌দীন ও জীবনানন্দ

56f45116d451db0bc01395655eaa7bc6-6acf5f9548fcc

দখলমুক্ত ফুটপাতের সৌন্দর্য বাড়াতে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দেয়ালচিত্রে যুক্ত হয়েছেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন ও কবি জীবনানন্দ দাশ। নগরসজ্জার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের পাশে দেয়ালজুড়ে এবার ফুটে উঠেছে বাংলা সাহিত্য ও সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তিন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি। সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন দখলমুক্ত ফুটপাতের পাশের দেয়ালে নতুন করে আঁকা হয়েছে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, জসীমউদ্‌দীন ও জীবনানন্দ দাশের ছবি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এই কাজ করা হয়।

নগরের সাধারণ দেয়ালকে শিল্প ও ঐতিহ্যের প্রদর্শনীতে রূপ দেওয়ার এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এর আগে একই দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যজিৎ রায়ের মতো শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিজগতের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল। নতুন তিনটি ছবি যুক্ত হওয়ায় দেয়ালটি এখন আরও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করছে।

দেয়ালচিত্রে ইতিহাস ও সংস্কৃতির ছোঁয়া

নতুন প্রতিকৃতিগুলোর মধ্যে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার ও সামাজিক জাগরণে তাঁর অবদান উপমহাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয়। অন্যদিকে, পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন তাঁর কবিতায় বাংলার গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের আবেগ তুলে ধরেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও স্বতন্ত্র কাব্যভাষার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

এ ধরনের প্রতিকৃতি নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পথচারীদের সামনে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও পথের পাশের দেয়াল হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস ও সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি উন্মুক্ত পরিসর।

Advertisements

তবে নতুন প্রতিকৃতি যুক্ত করার সময় আগের আঁকা সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর ছবিটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

আরও গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি যুক্ত করার পরিকল্পনা

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহবুবুর রহমান তালুকদার গণমাধ্যমকে জানান, দেয়ালে গুণী ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি যুক্ত করা নগরসজ্জার একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ। ভবিষ্যতে আরও বিশিষ্ট ব্যক্তির ছবি আঁকার জন্য কয়েকটি দেয়ালও চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই সেখানে কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি। সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরিয়ে অন্য ছবি আঁকার বিষয়ে তিনি বলেন, দেয়ালে যাঁদের প্রতিকৃতি রয়েছে, তাঁদের সময়কাল ও অবদানের সঙ্গে সঞ্জীব চৌধুরীর সময়ের পার্থক্য রয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্মের শিল্পী ও সংগীতজ্ঞদের অবদানও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। আইয়ুব বাচ্চু ও আজম খানের মতো সংগীতশিল্পীদের প্রতিকৃতি কোথায় আঁকা যায়, সে বিষয়েও ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় তরুণদের প্রতিকৃতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

ফুটপাত সংস্কারে পথচারীদের সুবিধা

শুধু দেয়ালচিত্র নয়, ফুটপাতটিকে পথচারীবান্ধব করে তুলতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ডিএসসিসি। সংস্কারকাজের অংশ হিসেবে বসানো হয়েছে ডাস্টবিন ও বেঞ্চ। পাশাপাশি মেরামত করা হয়েছে সীমানাপ্রাচীর। আগে ফুটপাতটির একটি অংশ দখল হয়ে থাকলেও তা উচ্ছেদের পর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়। গত ৫ অক্টোবর ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম ফুটপাতটির সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখল করে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না। তবে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনা করে বিকল্প স্থানে তাঁদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর গড়ার প্রত্যাশা

ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নগরবাসীর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক। তাঁর মতে, রাজধানীকে ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন’ রাখা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে নগরবাসীরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

সেগুনবাগিচার এই উদ্যোগে একদিকে যেমন দখলমুক্ত ফুটপাত ফিরে পেয়েছে পথচারীরা, অন্যদিকে দেয়ালচিত্রে স্থান পেয়েছে দেশের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিচিত মুখগুলো। নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে শিল্প ও ঐতিহ্যকে যুক্ত করার এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার জনপরিসর আরও নান্দনিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

Advertisements