১৪ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

‘সামাজিক ট্যাবু’ ভেঙে কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

192ab0a448f8b837533b785c93da2836-6acf4fed509dd

কৈশোরকালীন প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, পুষ্টি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক ট্যাবু দূর করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, শুধু আলোচনা নয়, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে।

কৈশোর জীবনের এমন একটি পর্যায়, যখন শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের পাশাপাশি তৈরি হয় নতুন কৌতূহল ও প্রশ্ন। কিন্তু সামাজিক সংকোচ, লোকলজ্জা এবং সচেতনতার অভাবে অনেক কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ১১তম জাতীয় যুব সম্মেলন অন হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার’-এর অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনের একজন কিশোর-কিশোরী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সুস্থ, সচেতন ও সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কৈশোরকালীন প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাকে জাতীয় নীতিনির্ধারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে

কৈশোরে শারীরিক পরিবর্তন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন ড. এম এ মুহিত। তবে সামাজিক ট্যাবু ও লোকলজ্জার কারণে অনেক কিশোর-কিশোরী এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে সংকোচ বোধ করে। কোথায় গেলে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে, কিংবা কার কাছে প্রশ্ন করা যাবে—তা নিয়েও তারা অনিশ্চয়তায় থাকে।

তিনি বলেন, অনেক সময় প্রশ্ন করার কারণে সন্তানদের ‘বেয়াদব’ আখ্যা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। মানসিক ট্রমা ও পারিবারিক সহিংসতার বিষয়েও সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এসব অভিজ্ঞতা কিশোর-কিশোরীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সমস্যাগুলো গোপন করে রাখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাই তাদের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সহানুভূতিশীল পরিবেশ, সময়মতো সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য পরামর্শ।

Advertisements

এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবারকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও কর্মসূচি সাজাতে হবে।

১ ডিসেম্বর থেকে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন

কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশের সব অঞ্চলের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি এক নয়। তাই একই ধরনের কর্মসূচির পরিবর্তে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নির্দিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে যেসব এলাকাকে বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, সেখানে বিশেষ লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরামর্শ

বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের তথ্য জানার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, যথাযথ কাউন্সেলিং এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক তরুণ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে এআই বা চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিচ্ছে। প্রাথমিক ধারণা অর্জনে প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তরুণদের জন্য সহজলভ্য, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্যের পাশাপাশি মনোসামাজিক কাউন্সেলিং পাওয়ার সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সচেতনতা থেকে বাস্তব পরিবর্তনের প্রত্যাশা

কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শুধু সচেতনতামূলক আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর নীতি, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, মানসিক সমস্যায় সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কৈশোরের নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই গুরুত্ব পেয়েছে একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা—যেখানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। সামাজিক সংকোচের পরিবর্তে সচেতনতা, নীরবতার পরিবর্তে সংলাপ এবং পরিকল্পনার পরিবর্তে কার্যকর বাস্তবায়নই কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisements