নেপালে বন্যায় আটকা ৯ বাংলাদেশি, ফুরিয়ে আসছে খাবার

নেপালের গোর্খা জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম জগতে বন্যা ও ভূমিধসের কারণে আটকা পড়েছেন ৯ বাংলাদেশিসহ শতাধিক বিদেশি পর্যটক। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বাড়ছে দুর্ভোগ। হেলিকপ্টারে উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা পর্যটকদের কাছে ক্রমেই কমে আসছে খাবারের মজুত।
নেপালের মধ্যাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনপ্রিয় মানাসলু ট্রেকিং রুট। দুর্গম এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছেন শতাধিক বিদেশি পর্যটক, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন বাংলাদেশি। তাঁদের একটি দল গোর্খা জেলার জগৎ গ্রামে অবস্থান করছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটকেরা এখন হেলিকপ্টারে উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আটকে পড়া বাংলাদেশি পর্যটক মো. শাহাদাত হোসেন তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে জানান, সোমবার থেকে তাঁরা জগৎ গ্রামে আটকা পড়ে আছেন। গ্রামের উঁচু এলাকা থেকে হঠাৎ বন্যার পানি নেমে এসে নিচের অংশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নিজেদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে শাহাদাত বলেন, তাঁরা আপাতত নিরাপদে থাকলেও সোমবার থেকে বিদ্যুৎ নেই। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবারের সংকট। মজুত থাকা খাবার ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হলে তাঁদের আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিপর্যস্ত ট্রেকিং রুট
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত মানাসলু ট্রেকিং রুট নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এই পথের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু, হাঁটার পথ এবং কয়েক শ বাড়িঘর পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ায় পর্যটকদের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মানাসলু সংরক্ষণ এলাকা প্রকল্পের কর্মকর্তা ভুবন রাজ ওঝা রয়টার্সকে জানান, ট্রেকিং রুটের কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পর্যটকেরা বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছেন। যাঁরা ফিরে যেতে চান, তাঁদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যাঁরা ট্রেকিং চালিয়ে যেতে আগ্রহী, তাঁদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার সুযোগ রয়েছে। পথের পাশের রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানগুলোও আপাতত নিরাপদ বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে খাবার ও বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে আটকে পড়া পর্যটকদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
ভূমিধসে নদীর প্রবাহ বন্ধ, প্লাবিত বিস্তীর্ণ এলাকা
রোববার ভোরে কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে গোর্খা জেলায় ভূমিধসের কারণে বুড়ি গণ্ডকী নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পানির প্রবল স্রোতে দুই শতাধিক বাড়িঘর ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও হাঁটার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক স্থানে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধার অভিযান জোরদার
নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সর্বশেষ বন্যায় এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে পাঁচজন গ্রামবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। নদীর পানির উচ্চতা কমতে শুরু করায় উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
সোমবার ১২ জন বিদেশিসহ মোট ৩২১ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবারও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান, পূর্ব নাওয়ালপারাসি ও পশ্চিম নাওয়ালপারাসি জেলার নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে নেপালের পাহাড়ি পথে যাত্রা করা পর্যটকদের জন্য আকস্মিক এই দুর্যোগ এখন নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জগৎ গ্রামে আটকে থাকা ৯ বাংলাদেশির ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার, খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগ পুনঃস্থাপনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



