‘পারফেক্ট ডেজ’: সাধারণ জীবনের ছোট ছোট আনন্দ

প্রতিদিন একই রুটিনে বাঁধা জীবন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, কাজে যাওয়া, দিন শেষে বাড়ি ফেরা—সবকিছুই যেন একঘেয়ে। কিন্তু এই চেনা জীবনের মধ্যেও কি খুঁজে পাওয়া যায় সুখ? জাপানের টোকিও শহরের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর গল্পের মধ্য দিয়ে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্স। তার পরিচালিত ‘পারফেক্ট ডেজ’ (Perfect Days) চলচ্চিত্রটি সাধারণ জীবনের সৌন্দর্য, মানসিক প্রশান্তি এবং ছোট ছোট আনন্দকে নতুন করে দেখতে শেখায়। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাপানি অভিনেতা কোজি ইয়াকুশো।
ষাটের কোঠায় থাকা হিরায়ামা টোকিওর বিভিন্ন পাবলিক টয়লেট পরিষ্কারের কাজ করেন। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের পোশাক পরেন, রাস্তার পাশের দোকান থেকে কফি কেনেন এবং নিজের ছোট ভ্যানে চড়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন। তার জীবন অত্যন্ত সাধারণ। কাজের ফাঁকে খুব বেশি কথা বলেন না তিনি। আশপাশের মানুষও তাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। অনেকে যেন তাকে দেখেও দেখেন না।

শুনতে এমন জীবনকে একঘেয়ে ও বিষণ্ন মনে হতে পারে। কিন্তু ‘পারফেক্ট ডেজ’ ঠিক তার উল্টো কথা বলে। চলচ্চিত্রটি দেখায়, জীবনের আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করে আমরা চারপাশের পৃথিবীকে কীভাবে দেখি তার ওপর। হিরায়ামা সাধারণ মানুষের চোখে অবহেলিত একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হলেও নিজের চোখে তিনি পৃথিবীর সৌন্দর্য খুঁজে পান।
ছোট ছোট মুহূর্তেই সুখ
চলচ্চিত্রটির মূল ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানি শব্দ ‘কোমোরেবি’। এর অর্থ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে এসে পড়া সূর্যের আলো। তবে শব্দটির তাৎপর্য শুধু প্রকৃতির একটি দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক এবং ছোট ছোট মুহূর্তকে মন দিয়ে উপভোগ করার বিষয়টিও বোঝানো হয়।

হিরায়ামা এই দর্শন নিজের জীবনে ধারণ করেছেন। অন্যরা যখন পার্কে থাকা একজন ভবঘুরেকে উপেক্ষা করে চলে যায়, তখন হিরায়ামা তার চলাফেরার মধ্যে একধরনের সৌন্দর্য খুঁজে পান। এমনকি সাধারণ কাজে ব্যবহৃত গণশৌচাগারগুলোকেও তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। কারণ, তার কাছে কোনো কাজ বা মানুষই তুচ্ছ নয়।
গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়া, আকাশের রং বদলে যাওয়া কিংবা দিনের চেনা দৃশ্য—সবকিছুই তার কাছে আনন্দের উৎস। নিজের ছোট অ্যাপার্টমেন্টে তিনি গাছের চারা যত্ন করে বড় করেন। প্রকৃতির প্রতি এই ভালোবাসা তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নীরব অভিনয়ে মুগ্ধতা
হিরায়ামার জীবনযাপনের ধরন খুব সাধারণ হলেও চরিত্রটি পর্দায় অসাধারণ হয়ে উঠেছে কোজি ইয়াকুশোর অভিনয়ে। সংলাপের ওপর বেশি নির্ভর না করেও তিনি চরিত্রটির মনের গভীরতা, অনুভূতি ও প্রশান্তি দর্শকের কাছে তুলে ধরেছেন। তার নীরবতা, মুখের অভিব্যক্তি এবং ছোট ছোট আচরণেই বোঝা যায়, হিরায়ামার ভেতরে কত সমৃদ্ধ একটি জগৎ রয়েছে।

চলচ্চিত্রটিতে সংগীতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হিরায়ামা ক্যাসেট টেপে ষাট ও সত্তরের দশকের পশ্চিমা রক ও পপ সংগীত শোনেন। তার পছন্দের শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন লু রিড, দ্য কিন্কস, প্যাটি স্মিথ ও ওটিস রেডিং। পাশাপাশি তিনি শোনেন নিনা সিমোনের ‘ফিলিং গুড’। এসব গানের মধ্য দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব ও মনের অবস্থার নানা দিক ফুটে ওঠে।
গান শোনা, পুরোনো বই পড়া এবং ফিল্ম ক্যামেরায় পছন্দের মুহূর্তগুলো ধরে রাখা—এসব অভ্যাসেই হিরায়ামার আনন্দ। নতুন কিছু পাওয়ার জন্য সব সময় ছুটে বেড়ানোর বদলে তিনি যা আছে, তার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে নেন। তবে তার অতীত জীবন সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সবকিছু স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে চরিত্রটির মধ্যে একধরনের রহস্যও থেকে যায়।

ধীরগতির গল্পে জীবনের গভীর বার্তা
‘পারফেক্ট ডেজ’ ভিম ভেন্ডার্সের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রশংসিত কাহিনিচিত্র। এর ধীরগতির গল্প বলার ধরন, নীরব মুহূর্ত এবং জীবনের গভীর উপলব্ধি জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইয়াসুজিরো ওজুর কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভেন্ডার্সের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘উইংস অব ডিজায়ার’-এর মতো এখানেও সাধারণ জীবনের মধ্যে অসাধারণ কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
চলচ্চিত্রটি সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়নও পেয়েছিল। তবে এর গুরুত্ব শুধু পুরস্কার বা প্রশংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দর্শককে নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে শেখায়।
বর্তমান সময়ে নতুন অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও বিনোদনের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা প্রায়ই আশপাশের ছোট ছোট আনন্দ উপেক্ষা করি। হিরায়ামার জীবন তার বিপরীত। তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তির বদলে ক্যাসেট টেপ ও ফিল্ম ক্যামেরার মতো পুরোনো মাধ্যম পছন্দ করেন। এগুলো তার কাছে স্মৃতি, মনোযোগ ও ধীরস্থির জীবনযাপনের প্রতীক।

‘পারফেক্ট ডেজ’ কোনো নাটকীয় ঘটনা বা বড় ধরনের সংঘাতের ওপর নির্ভর করে না। বরং এর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোতে। সুখ মানেই বড় বাড়ি, দামি জিনিস কিংবা প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতা নয়। কখনো কখনো এক কাপ কফি, পছন্দের গান, গাছের পাতায় খেলা করা রোদ কিংবা একটুখানি নীরবতাও জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারে।
‘পারফেক্ট ডেজ’ শুধু একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর গল্প নয়; এটি নিজের মতো করে বাঁচতে শেখার এক কোমল আহ্বান। জীবনকে সুন্দর করে তুলতে সব সময় নতুন কিছু পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিচিত পৃথিবীটাকে একটু মন দিয়ে দেখলেই হয়তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব নিজের ‘পারফেক্ট ডেজ’—সুন্দর দিনগুলো।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



