পশুরা কি সত্যিই মানুষের ভাষা বুঝতে পারে?

পোষা কুকুরকে আদর করে কথা বলা, বিড়ালকে কাছে ডাকলে তার সাড়া দেওয়া কিংবা গরুকে নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে কাজ করানো—এমন দৃশ্য আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। অনেক সময় মনে হয়, প্রাণীরা যেন মানুষের প্রতিটি কথাই বুঝতে পারে। কিন্তু সত্যিই কি তারা মানুষের ভাষা বোঝে, নাকি কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি ও পরিচিত সংকেত থেকে আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়?
বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, কিছু প্রাণী মানুষের নির্দিষ্ট শব্দের অর্থ শিখতে পারে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে মানুষের মতো ভাষার জটিল অর্থ, ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন বোঝার ক্ষমতা তাদের রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
মানুষের কথা বুঝেছিল ‘ক্লেভার হ্যান্স’ ঘোড়া?

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মানির ‘ক্লেভার হ্যান্স’ নামের একটি ঘোড়া বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তার মালিকের দাবি ছিল, ঘোড়াটি মানুষের কথা বুঝতে পারে, সময় বলতে পারে এবং এমনকি গাণিতিক হিসাবও করতে পারে।
ঘটনাটি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, হ্যান্স আসলে অঙ্ক কষছিল না। বরং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় উপস্থিত মানুষের মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়া লক্ষ করত। সঠিক উত্তরের কাছাকাছি পৌঁছালে মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে কখন থামতে হবে, তা বুঝে নিত।
এই ঘটনা প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো প্রাণী সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখালেই ধরে নেওয়া যায় না যে সে মানুষের ভাষার অর্থ বুঝেছে। সে হয়তো পরিচিত সংকেত বা অঙ্গভঙ্গি অনুসরণ করছে।
বানর কি মানুষের ভাষা শিখতে পারে?

প্রাণীদের ভাষা শেখার ক্ষমতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে গরিলা, শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোর ওপর গবেষণা করেছেন।
কোকো নামের একটি গরিলা ইশারার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য পরিচিতি পেয়েছিল। তার প্রশিক্ষকদের দাবি ছিল, সে বহু ইশারা ও ইংরেজি শব্দের সঙ্গে পরিচিত ছিল। তবে কোকোর ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। প্রশিক্ষকেরা তার কিছু ইশারার অর্থ কীভাবে নির্ধারণ করেছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, কানজি নামের একটি বোনোবো বিশেষ প্রতীকসংবলিত বোর্ড ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে শিখেছিল। প্রতীকগুলোর সাহায্যে সে খাবার, বস্তু, স্থান ও বিভিন্ন কাজ সম্পর্কে নিজের চাহিদা প্রকাশ করতে পারত।
গবেষণায় কানজির ইংরেজি নির্দেশ বোঝার ক্ষমতারও প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিচিত পরিস্থিতির বাইরে নতুন নির্দেশ শুনে কাজ করার ক্ষেত্রেও সে দক্ষতা দেখিয়েছিল।
তবে শব্দ বা প্রতীক চিনতে পারা আর মানুষের মতো ব্যাকরণ মেনে জটিল বাক্য তৈরি করা এক বিষয় নয়। প্রাণীরা কতটা ভাষা বোঝে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
কুকুর কি মানুষের কথা বুঝতে পারে?

মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের কারণে কুকুর মানুষের কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ বুঝতে বিশেষভাবে দক্ষ। পরিচিত নির্দেশ, যেমন ‘বসো’, ‘এসো’ কিংবা ‘বাইরে চলো’—এসব শব্দ শুনে অনেক কুকুর নির্দিষ্ট আচরণ করে।
তবে কুকুর কেবল শব্দের অর্থ থেকেই প্রতিক্রিয়া জানায় না। মালিকের কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি, হাতের ইশারা এবং পরিস্থিতিও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
চেজার নামের একটি বর্ডার কলি জাতের কুকুর এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরিচিত। গবেষণার মাধ্যমে সে এক হাজারেরও বেশি বস্তুর নাম শিখেছিল বলে জানা যায়। কোনো বস্তুর নাম শুনে সেটি খুঁজে বের করা এবং পরিচিত নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার দক্ষতা তার ছিল।
এ ছাড়া বোতামচালিত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করেও কুকুরের আচরণ নিয়ে গবেষণা চলছে। এসব বোতাম চাপলে নির্দিষ্ট শব্দ শোনা যায়। তবে বোতাম চাপার মাধ্যমে কুকুর সত্যিই মানুষের মতো নিজের ভাবনা প্রকাশ করছে, নাকি শেখা সংকেতের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তা নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গরু, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণী কি কথা বোঝে?

কুকুরের পাশাপাশি বিড়াল, ঘোড়া ও গরুর মতো প্রাণীরাও মানুষের নির্দিষ্ট সংকেত বুঝতে পারে। পোষা বিড়াল নিজের নামের শব্দ অন্য শব্দ থেকে আলাদা করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। একইভাবে, গরু পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর, খাবার দেওয়ার সংকেত কিংবা নিয়মিত ব্যবহৃত নির্দেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে প্রাণীরা শব্দের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি থেকেও শেখে। যেমন, নির্দিষ্ট শব্দ শুনলেই খাবার পাওয়া গেলে তারা ধীরে ধীরে শব্দটির সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক তৈরি করে।
অর্থাৎ, প্রাণীর প্রতিক্রিয়ার পেছনে শেখা অভ্যাস, স্মৃতি, শ্রবণক্ষমতা ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাহলে প্রাণীরা মানুষের ভাষা কতটা বোঝে?
বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, কিছু প্রাণী মানুষের নির্দিষ্ট শব্দ, নির্দেশ ও যোগাযোগের সংকেত বুঝতে পারে। কোনো কোনো প্রাণী শত শত শব্দ বা প্রতীকও শিখতে পারে। তবে মানুষের মতো ভাষার সব সূক্ষ্ম অর্থ, জটিল ব্যাকরণ ও বিমূর্ত ধারণা বোঝার ক্ষমতা তাদের রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।
প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাই তাদের শব্দের প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি শরীরী ভাষা, আচরণ ও পরিস্থিতিও লক্ষ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, প্রাণীরা মানুষের প্রতিটি কথা বুঝতে না পারলেও পরিচিত শব্দ, কণ্ঠস্বর ও অঙ্গভঙ্গি থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ তাদের এই দক্ষতা আরও বাড়াতে সাহায্য করে।



