শ্রেণিকক্ষে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে শিক্ষকদের শারীরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দিচ্ছে ডেনমার্ক

ডেনমার্কে শ্রেণিকক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকদের শারীরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, আগামী বছরের আগস্ট থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য কক্ষে সরিয়ে নিতে পারবেন। স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি এবং বিশৃঙ্খল আচরণ নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জের মুখে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির মধ্য-বামপন্থী সরকার এই আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ডেনমার্কের স্কুলগুলোতে কোনো শিক্ষার্থী নিজের, অন্যের কিংবা স্কুলের সম্পত্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি করলেই কেবল শারীরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমতি রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এই বিধানের পরিধি বাড়ানো হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় আনুপাতিকভাবে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা যাবে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ম্যাগনাস হিউনিকে বলেন, শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শিক্ষকদের কী করার অনুমতি রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শিক্ষকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সহিংস পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে কোনো শিক্ষককে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকতে হবে না।
ডেনমার্কে ১৯৬৭ সালে স্কুলে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশটির ৫৫ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে অন্তত একবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শারীরিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে এ ধরনের ঘটনা মাসে অন্তত একবার ঘটেছে।
বয়সভেদে সহিংসতার হারেও পার্থক্য দেখা গেছে। শূন্য থেকে তৃতীয় শ্রেণির ৭৫ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে শারীরিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এ হার ৫৯ শতাংশ এবং সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে ২৭ শতাংশ।
জরিপে আরও দেখা গেছে, এসব ঘটনার বেশির ভাগের সঙ্গে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়িত। সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এমন শ্রেণিকক্ষগুলোর ৬০ শতাংশে শিক্ষকদের মতে, মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষার্থী এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে সহিংসতা বা আক্রমণাত্মক আচরণের উচ্চ হারের কোনো সাধারণ সম্পর্ক খুঁজে পাননি।
ডেনমার্কের শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি গর্ডন ওরস্কভ ম্যাডসেন বলেন, শারীরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে নেতিবাচক পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক শিক্ষক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেন। তাঁর ভাষ্য, গত এক বছরে প্রতি তিনজন শিক্ষকের একজন শ্রেণিকক্ষে শান্তি ফিরিয়ে আনতে শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে গেছেন।
শিক্ষকদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির দাবিও দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে দেশটির জাতীয় শিক্ষক ইউনিয়ন। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া গত বছরের শরৎকালে তৈরি করেছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ম্যাটিয়াস তেসফায়ে। স্কুলে শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি।
তবে প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরোধিতা করেছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলো। এর আগে ৫০০-এর বেশি বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি সংস্থা একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে এই উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায়।
ন্যাশনাল চিলড্রেনস রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক রাসমুস কিয়েলদাল সতর্ক করে বলেন, শিক্ষকদের শারীরিকভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণের অনুমতি দেওয়া হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, শিক্ষকেরা পুলিশ কর্মকর্তার মতো আচরণ করলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়বে।
ডেনমার্কের প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বিদ্যমান বিধানেরও মিল রয়েছে। ইংল্যান্ডে শিক্ষকরা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কিংবা মানুষ ও সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তিসংগত মাত্রায় শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন। তবে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এমন শক্তি প্রয়োগের অনুমতি নেই।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ



