৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবরার ফাহাদের পরিবারের সাক্ষাৎ, দ্রুত বিচার ও নানা দাবির কথা জানাল পরিবার

780a5dce34deae711d1713f8ddd979af-6ac7940ae7e7f

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আবরারের হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারসহ পরিবারের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়।

সাক্ষাতে আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ, এক মামা ও এক চাচা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন।
আবরারের বাবা তাঁর ছেলের হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালত স্বাধীনভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তবে পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

সাক্ষাতে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিও জানান আবরারের বাবা। তাঁর ভাষ্য, ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ এখনো সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি সেতুটি নির্মাণের অনুরোধ জানালে এ বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি সেতুটির নাম আবরার ফাহাদের নামে করার প্রতিশ্রুতিও দেন প্রধানমন্ত্রী।

আবরারের কবর পাকাকরণ এবং পাশের মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার বিষয়েও সহযোগিতা চান তাঁর বাবা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মসজিদটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। সাক্ষাতে আবরার হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের বিষয়টিও উঠে আসে। আবরারের বাবা জানান, মামলার একজন আসামি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পরিবার বিষয়টি জানতে পারে। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

আবরারের মা রোকেয়া খাতুনের কণ্ঠেও ছিল সন্তান হারানোর গভীর বেদনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। তাঁর কথায়, প্রতিটি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীই কোনো না কোনো মায়ের সন্তান; আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।

ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীকে বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি নতুন হল নির্মাণের দাবি তোলেন তিনি। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। নতুন প্রজন্মের কাছে আবরার ফাহাদের ঘটনা তুলে ধরতে পাঠ্যবইয়ে তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান ফাইয়াজ। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের তালিকার মতো বিভিন্ন সময়ে নিহত ব্যক্তিদেরও একটি তালিকা তৈরির দাবি জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

Advertisements

সাক্ষাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আবরারের পরিবারের সদস্যরা।

যে হত্যাকাণ্ড বদলে দিয়েছিল বুয়েটের পরিবেশ

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে আবরার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করেছিলেন। পরদিন রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাঁকে হলে ডেকে ওই পোস্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে অচেতন অবস্থায় তাঁকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়।

ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত মারধরের কারণে শরীরে গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন।

আবরারের বাবা ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ডিবি ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখেন। এরপর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা নয় আসামি আপিল বিভাগে আপিল করেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আবরারের পরিবার এখন অপেক্ষা করছে সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতির। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা—আবরারের স্মৃতি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস হয়ে না থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ন্যায়বিচার, নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ও মতপ্রকাশের অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকুক।

Advertisements