নেকাব পরা ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ বলার অভিযোগ, ঢাবি শিক্ষককে সব ক্লাস থেকে অব্যাহতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একটি শ্রেণিকক্ষে নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ঘিরে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ওই শিক্ষক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’, ‘জঙ্গি’ এবং তিনি ‘বোমা মারতে পারেন’—এমন মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর জরুরি সভা করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বিভাগের সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইংরেজি বিভাগের একাডেমিক কমিটি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের একটি ক্লাসে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। ঘটনার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী লিখিতভাবে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জানান। এরপর বৃহস্পতিবার জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা ডেকে অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি বা চেয়ারম্যানের নেই বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট।
কী ঘটেছিল শ্রেণিকক্ষে?
অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নেকাব ও পোশাক নিয়ে ওই শিক্ষকের সঙ্গে আগেও কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। ভুক্তভোগী ছাত্রী মল্লিকার দাবি, শিক্ষক তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং কেন তিনি এভাবে পোশাক পরেন, তা জানতে চেয়েছিলেন। মল্লিকার অভিযোগ, একপর্যায়ে শিক্ষক তাকে বলেন, তিনি ক্লাসে এভাবে বসে থাকলে অস্বস্তি ও অনিরাপদ বোধ করছেন। এরপর তাকে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে বসতে বলা হয়। পরে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান বলেও দাবি করেন তিনি।
মল্লিকার আরও অভিযোগ, আগের একটি ক্লাসে তাকে নেকাব খুলে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শিক্ষককে অফিস সময়ে দেখা করে পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু এরপরও তাকে শনাক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নেকাব ও পোশাক নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে বুধবারের ঘটনাটিকে তিনি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না।
‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা মারতে পারে’—এমন মন্তব্যের অভিযোগ
ঘটনার বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, নেকাব পরা শিক্ষার্থীর পোশাকের বিষয়ে আলোচনার সময় তিনি ওই ছাত্রীকে সমর্থন করে কথা বলেছিলেন।
সুমির অভিযোগ, এ সময় শিক্ষক ইসলাম পালন, মাযহাব এবং ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন। পরে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে সমর্থন করায় তার প্রতিও শিক্ষক ক্ষুব্ধ হন। দাবি, একপর্যায়ে শিক্ষক নেকাব পরা ওই শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং তাকে ‘বোমা মারতে পারেন’—এমন মন্তব্য করেন। পর্দা ও পোশাকের বৈচিত্র্য বোঝাতে আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনের মানুষের উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের আরও দাবি, ওই ক্লাসে পোশাকের সীমা নিয়েও শিক্ষক মন্তব্য করেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগও করেছেন সুমি। তার দাবি, শিক্ষক নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করে তার কোনো ক্ষতি করা সম্ভব নয়—এমন কথাও বলেছেন।
এখন কী হবে?
ঘটনার দিনই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরপর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের আনা অভিযোগ সম্পর্কে অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা কী হবে, তা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।



