ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনে ট্রাম্পের সাড়ে ৮ ফুট উঁচু ন’গ্ন ভাস্কর্য ‘অরেঞ্জ প্লেগ’

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভবনে ঢুকলেই চোখে পড়ছে বিশাল এক সোনালি ভাস্কর্য। দূর থেকেই বোঝা যায়, এটি আর দশটি ভাস্কর্যের মতো নয়। প্রায় সাড়ে আট ফুট উঁচু এই ভাস্কর্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখানো হয়েছে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। নাম দেওয়া হয়েছে ‘অরেঞ্জ প্লেগ’। ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও বিতর্ক।
ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি ভবনের সংযোগস্থলের ব্যস্ত একটি জায়গায় প্রদর্শিত হচ্ছে ভাস্কর্যটি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে এটি রাখার কথা রয়েছে।

২৩ ক্যারেট সোনার পাতে মোড়ানো ভাস্কর্যটিতে ট্রাম্পের এক হাতে রয়েছে গলফ ক্লাব, অন্য হাতে ন্যায়বিচারের পাল্লা। পাশে রাখা হয়েছে একটি গলফ বল, যার নকশা পৃথিবীর আদলে তৈরি। পুরো শিল্পকর্মটির মধ্য দিয়ে শিল্পী মূলত ক্ষমতা, রাজনীতি ও বিশ্বব্যবস্থার প্রতি একটি তীক্ষ্ণ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ভাস্কর্যটির আরেকটি পরিচিত নাম ‘কিং অব ইনজাস্টিস’ বা ‘অবিচারের রাজা’। এতে নগ্ন ট্রাম্পকে দেখা যায় তুলনামূলক ছোট পোশাক পরা এক ব্যক্তির কাঁধের ওপর বসে থাকতে। যেন একজন ক্ষমতাবান শাসক নিজের ভার অন্য একজনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছেন।
ভাস্কর্যের বেদিতেও রয়েছে ব্যঙ্গাত্মক বার্তা। সেখানে লেখা হয়েছে, একজন মানুষের পিঠে চেপে বসে থাকা ব্যক্তি তাঁর ভারে ওই মানুষটিকে তলিয়ে দিলেও পিঠ থেকে নামতে রাজি নন—বরং তাঁকে সাহায্য করার কথা বলেই নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। ডেনমার্কের শিল্পী জেনস গালচিওট তৈরি করেছেন এই আলোচিত ভাস্কর্য। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে তিনি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখেন। তাই তাঁর মতে, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা এবং কথিত ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়া জরুরি।
শিল্পকর্মটির ভাবনায় রয়েছে বিখ্যাত রূপকথা ‘দ্য এম্পেররস নিউ ক্লথস’-এর ছায়াও। সেই গল্পে এক দাম্ভিক শাসক মনে করেছিলেন, তিনি অত্যন্ত দামি পোশাক পরে আছেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন নগ্ন। কিন্তু ভয় ও চাটুকারিতার কারণে আশপাশের কেউ সত্য কথাটি বলতে সাহস করেনি। শেষ পর্যন্ত একটি শিশু সবাইকে জানিয়ে দেয়, শাসকের গায়ে আসলে কোনো পোশাক নেই। জেনস গালচিওটের মতে, তাঁর ভাস্কর্যেও সেই গল্পের প্রতীকী অর্থ তুলে ধরা হয়েছে—ক্ষমতার সামনে সত্য কথা বলার সাহস এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিণতি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ডেনিশ সদস্য পার ক্লসেনও ভাস্কর্যটির প্রদর্শন নিয়ে ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর মন্তব্য, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এমন একটি শিল্পকর্ম প্রদর্শন সহ্য করা গেলেও বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের কোনো স্থান নেই।
তবে ভাস্কর্যটি নিয়ে এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এটি অবশ্য নতুন কোনো শিল্পকর্ম নয়। এর আগে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ প্রথমবারের মতো সোনালি এই ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছিল। পরে জার্মানিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের সময়ও এটি প্রদর্শিত হয়।
রাজনীতি, ব্যঙ্গ ও শিল্পের এই অদ্ভুত মিশ্রণ এবার জায়গা করে নিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অন্যতম ব্যস্ত প্রাঙ্গণে। ফলে ভাস্কর্যটি যতটা শিল্পকর্ম, ততটাই যেন সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিকে ঘিরে একটি প্রকাশ্য মন্তব্য।



