মানুষের কোলাহলে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের প্রিয় পাখির কণ্ঠস্বর

হিমালয়ের অপূর্ব সুন্দর পাখি মনালের জীবনযাত্রা ও যোগাযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ড। ভারতীয় গবেষকদের পাঁচ বছর ধরে চালানো দুটি পৃথক গবেষণায় উঠে এসেছে, অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটনের বিস্তার, শব্দদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাখিটির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি তার ডাকেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
পুরুষ মনালের শরীরে সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের দৃষ্টিনন্দন পালক দেখা যায়। ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাজ্য-পাখি এবং নেপালের জাতীয় পাখি হওয়ায় হিমালয় অঞ্চলের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গেও পাখিটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মানুষের বসতি, পর্যটনকেন্দ্র ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে মনালের স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে শব্দদূষণ। এর ফলে মানুষের কোলাহল ভেদ করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে মনাল তার ডাকের পিচ বা সুর পরিবর্তন করছে।
উত্তরাখণ্ডের গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, গাছের সীমানার ওপরে থাকা আলপাইন তৃণভূমিতে মানুষের উপস্থিতি ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মনালকে আরও উঁচু পাহাড়ের দিকে সরে যেতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ভবিষ্যতে পাখিটির উপযোগী আবাসস্থল আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, ২১০০ সাল নাগাদ ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে মনালের উপযোগী আবাসস্থল ক্রমাগত কমতে ও খণ্ড-বিখণ্ড হতে পারে। এতে পাখিগুলো ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, ফলে তাদের মধ্যে প্রজননের সুযোগ কমে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংখ্যা হ্রাস কিংবা স্থানীয়ভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অন্য গবেষণায় মনালের ডাকের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ কস্তুরী মৃগ অভয়ারণ্যের চোপতা ও তুলনামূলক শান্ত মদ্মহেশ্বর উপত্যকায় গবেষকেরা ৭০০টির বেশি মনালের ডাক রেকর্ড করেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এক বছর ধরে এসব ডাকের পিচ, স্থায়িত্ব এবং আশপাশের শব্দদূষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়।
এতে দেখা যায়, কোলাহলপূর্ণ চোপতা এলাকার মনাল শান্ত মদ্মহেশ্বরের পাখিদের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বেশি পিচে ডাকছে। পাশাপাশি তাদের ডাকের ব্যাপ্তিতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা গেছে। গবেষকদের ধারণা, যানবাহন ও পর্যটকদের তৈরি নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দ ভেদ করে নিজেদের বার্তা পৌঁছাতেই পাখিগুলো এমন আচরণগত পরিবর্তন করছে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে মনালের কণ্ঠস্বর স্থায়ীভাবে বা বিবর্তনগতভাবে বদলে গেছে। বরং ভিন্ন শব্দ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পাখিটির আচরণগত অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ মিলেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ড. রাজীব লোচনের মতে, মনালের আবাসস্থল ও কণ্ঠস্বর—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দেখা যাওয়া হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ এই পাখিটি উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিবেশবিদ বিশাল সিং বলেন, মনালের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির জন্যও সতর্কবার্তা। তার মতে, অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যদি পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে হিমালয়ের জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নগরায়ণ, অবকাঠামোগত বিস্তার ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মনালের ওপর পরিচালিত এই গবেষণাগুলো তাই শুধু একটি পাখির পরিবর্তন নয়, পুরো হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত সংকটেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।



