গাজায় দুই স্বামী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে নবজাতককে নিয়ে নিসরিনের লড়াই

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় স্বামী ও দুই সন্তানকে হারিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী নিসরিন তোওমান। সেই শোক সামলে বোনের সন্তানদের দেখাশোনার কথা ভেবে দ্বিতীয়বার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, মাত্র আট মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্বামীকেও হারাতে হয়েছে তাকে। এখন নবজাতক কন্যাকে নিয়ে একাই জীবন কাটাচ্ছেন নিসরিন।

২০২৪ সালের ৮ জুন মধ্য গাজার নুসেইরাতে নিজ বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় প্রথম স্বামী সামি এবং দুই সন্তান মাহমুদ ও লাইথকে হারান নিসরিন। হামলার আগে তার সন্তানরা বাড়ির বাইরে খেলছিল।
নিসরিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ বোমা ও গুলির শব্দ শুনে সন্তানদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে বাইরে যান সামি। নিজের ভাই-বোনের সন্তানদেরও নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পর পরিস্থিতি দেখতে আবার বাইরে বের হন তিনি। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি।
পরে নিসরিন জানতে পারেন, একটি ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টার থেকে গুলি করে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর তাদের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন নিসরিন। জ্ঞান ফেরার পর সন্তানদের খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, মাহমুদ ও লাইথ দুজনই মারা গেছে।
নিসরিন জানান, সন্তানদের মরদেহ প্রায় দুই ঘণ্টা কোলে নিয়ে বসেছিলেন তিনি। পরে রেডক্রসের সহায়তায় পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই হামলায় তার পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তার এক বোনও ছিলেন।
ওই দিন নুসেইরাতে চালানো ইসরায়েলি অভিযানে প্রায় ২৮০ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছিল, চার জিম্মিকে উদ্ধারের জন্য ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
বোনের মৃত্যুর পর তার স্বামীও সন্তানদের নিয়ে একা হয়ে পড়েন। তাদের চার সন্তান মাকে হারায়। কিছুদিন পর তিনি নিসরিনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
প্রথমে এই প্রস্তাবে রাজি হননি নিসরিন। স্বামী ও দুই সন্তানকে হারানোর পর নতুন করে সংসার করার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না তিনি। তবে বোনের চার সন্তানের ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে মাত্র এক বছর বয়সী একটি শিশুর কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে সম্মতি দেন।
নিসরিন জানান, দ্বিতীয় বিয়ের পর শুরুতে তাদের আর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। পরে মায়ের পরামর্শে আবারও মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ সময় মৃত দুই সন্তানকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখতেন বলেও জানান নিসরিন।
কিন্তু নতুন সংসারও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই দ্বিতীয় স্বামী মোহাম্মদ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
নিসরিনের ভাষ্য, সেদিন সকালে সন্তানদের সঙ্গে নাশতা করার পর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বের হন মোহাম্মদ। কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান তিনি। পরে এক প্রতিবেশী এসে জানান, নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের কাছে কয়েকজনকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মোহাম্মদও ছিলেন।
দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর খবর নিসরিনকে আবারও গভীর শোকে ডুবিয়ে দেয়। তবে স্বামী হারানোর চার মাস পর তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। মেয়েটির নাম রাখা হয়েছে সিদরা।
বর্তমানে সিদরাকে নিয়েই দিন কাটছে নিসরিনের। অন্যদিকে তার বোনের চার সন্তান, যারা একই সঙ্গে তার দ্বিতীয় স্বামীর সন্তান, তারা তাদের দাদার সঙ্গে থাকে। সুযোগ পেলেই তাদের দেখতে যান তিনি।
যুদ্ধ, স্বজন হারানোর শোক আর একের পর এক বিপর্যয়ের মধ্যেও নবজাতক মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিসরিন।
সূত্র: আলজাজিরা



