৭ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ক্যানসার, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা

Different-Types-of-Cancer_Featur

৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কয়েক ধরনের ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের ক্যানসার-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন প্রবণতা পেয়েছে ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড (ডব্লিউসিআরএফ)। তরুণদের মধ্যে ক্যানসারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডে ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৫০ বছরের কম বয়সীদের প্রোস্টেট ক্যানসারের হার প্রায় চার গুণ হয়েছে। একই সময়ে অন্ত্র, কিডনি ও জরায়ুর ক্যানসারের হার দুই গুণেরও বেশি বেড়েছে।

তিন দেশের তথ্য পর্যালোচনা করে ডব্লিউসিআরএফ জানিয়েছে, ইংল্যান্ডে সাত ধরনের, যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ ধরনের এবং নেদারল্যান্ডসে চার ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে কম বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

জীবনযাপন কতটা দায়ী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি, ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মতো জীবনযাপন-সম্পর্কিত বিষয়গুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।

এর পাশাপাশি বায়ুদূষণ, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও প্লাস্টিকের সংস্পর্শও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে তরুণদের মধ্যে ক্যানসার বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট একটি কারণকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

গবেষকেরা আরও মনে করছেন, ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আগের তুলনায় দ্রুত রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণেও কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে।

Advertisements

ইংল্যান্ডে কোন ক্যানসার কতটা বেড়েছে?

ইংল্যান্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসারের হার ২০০১ সালে প্রতি এক লাখে একজন ছিল। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬ জনে।

একই সময়ে অন্ত্রের ক্যানসারের হার প্রতি এক লাখে ৩ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৪ জন হয়েছে। জরায়ু ও কিডনি ক্যানসারের হারও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯ ও ৩ জনে পৌঁছেছে।

স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০০১ সালে প্রতি এক লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪২ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৪৭ দশমিক ৫ জন। পাশাপাশি অগ্ন্যাশয় ও যকৃতের ক্যানসারের হারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের ২০০০ সালের পরের তথ্য বিশ্লেষণেও একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে। দেশটিতে ৫০ বছরের কম বয়সীদের কিডনি ক্যানসারের হার প্রতি এক লাখে ২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ৩ জন হয়েছে।

অন্ত্র, জরায়ু ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের হারও ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। স্তন ক্যানসারের হার বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

নেদারল্যান্ডসেও তরুণদের মধ্যে অন্ত্র, কিডনি, যকৃত ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে তিন দেশেই একটি ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের হার কমেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর সঙ্গে ধূমপানের প্রবণতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

কেন ‘টাইমবোমা’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

তরুণদের মধ্যে ক্যানসারের এই পরিবর্তনশীল চিত্রকে দ্রুত গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা। কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের ডিজিটাল হেলথের অধ্যাপক মার্ক ললার বিষয়টিকে একটি ‘টাইমবোমা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে তরুণদের মধ্যে ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ডব্লিউসিআরএফের গবেষণা ও নীতিবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক গিওটা মিত্রও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ক্যানসারের ধরন ও প্রবণতার এই পরিবর্তনকে ক্যানসার প্রতিরোধ ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ডব্লিউসিআরএফের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যানসারের সঙ্গে পরিবর্তনযোগ্য বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব, অ্যালকোহল ও ধূমপান এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, তরুণদের মধ্যে ক্যানসার বৃদ্ধির পূর্ণ কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

এদিকে কিংস কলেজ লন্ডন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নতুন গবেষণা শুরু করেছে। ক্যানসার রিসার্চ ইউকের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অন্ত্রের ক্যানসার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জীবনযাপন এবং রোগ শনাক্তকরণের ভূমিকা কতটা—তা খতিয়ে দেখা হবে।

Advertisements