৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

‘পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই’ ঢামেকে নার্সের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

f6a8e3d518e4d4c926c7b76ed4757643-6a184a9651ac8

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বাথরুম থেকে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নেমে এসেছে শোক ও রহস্যের আবহ। পরে পরিচয় শনাক্ত হয়—তন্ময়ী মণ্ডল, বয়স ২৮ বছর। রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, প্রেমিক আকাশ মিত্রের মৃত্যুর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তন্ময়ী। তার পাশে পাওয়া একটি চিরকুটেও সেই সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত মিলেছে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি একটি বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে বিকেলে মর্গে এসে স্বজনরা মরদেহটি তন্ময়ী মণ্ডলের বলে শনাক্ত করেন।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ঐচার মাঠ গ্রামের মেয়ে তন্ময়ী দুই বোনের মধ্যে বড়। বাবা বিভূত মণ্ডল মারা গেছেন। ঢাকায় তিনি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের হোস্টেলে থাকতেন এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

তন্ময়ীর ছোট বোন তন্দ্রা মণ্ডলের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা আকাশ মিত্রের সঙ্গে তন্ময়ীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আকাশ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে থাকতেন এবং তিনি বিবাহিত ছিলেন। শুরুতে বিষয়টি তন্ময়ী জানতেন না। পরে জানতে পারলেও আকাশ তাকে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে তার সংসারেও চলছিল নানা জটিলতা। এর মধ্যেই রোববার আসে আকাশের মৃত্যুর খবর। আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আকাশ আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন তন্ময়ী।

আকাশের মৃত্যুর পরদিনই হাসপাতালের বাথরুম থেকে তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাশে পাওয়া চিরকুটে লেখা ছিল—‘তুমি পৃথিবীতে নাই, আমিও বাঁচব না।’ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলাম জানান, আকাশের কাছ থেকে পাওয়া একটি চিঠিতে আর্থিক সংকটের কথা উঠে এসেছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই।’ চিঠিতে তন্ময়ীর কাছে তার টাকা পাওনা থাকার কথাও উল্লেখ ছিল। তবে টাকার পরিমাণ বলা হয়নি। তার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তন্ময়ীর মৃত্যুর ঘটনায় আরও কিছু বিষয় তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। তার মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে রক্তের দাগসহ একটি কালো স্টিলের ছুরি পাওয়া যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী সন্তোষ সকালে সেটি দেখতে পান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয় এবং জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান জানান, কনফারেন্স রুমের সামনে রক্তের দাগ ও ছুরি পাওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Advertisements

হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসাইন জানান, পুরো বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফুটেজে তন্ময়ীকে হাসপাতালের ভেতরে একা হাঁটতে দেখা গেছে। তবে বাথরুমের ভেতরের কোনো দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ হয়নি।

শাহবাগ থানার পুলিশ জানিয়েছে, প্রেমঘটিত বিষয়টি তন্ময়ীর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে শুধু প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে তন্ময়ীর হাসপাতালের ভেতরে চলাফেরা, বাথরুমে যাওয়ার আগের সময়ের গতিবিধি, উদ্ধার হওয়া চিরকুট, রক্তের দাগ, ছুরি এবং সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছুই তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

একদিকে ঋণ ও আর্থিক সংকটে ভেঙে পড়া আকাশের মৃত্যু, অন্যদিকে তার মৃত্যুর পরপরই তন্ময়ীর এমন পরিণতি—ঘটনাটি তাই কেবল একটি মৃত্যুর ঘটনা হয়ে থাকছে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্পর্ক, মানসিক বিপর্যয় ও হাসপাতালের ভেতরের রহস্যজনক কিছু আলামতও তদন্তকারীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর।

Advertisements