এশিয়ার বাজারে তেলের দাম ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নামাল সৌদি আরব

বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসের জন্য এশীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা সৌদি তেলের দাম গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
সোমবার প্রকাশিত সৌদি আরামকোর মূল্য নির্ধারণী নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের বেঞ্চমার্ক অনুসরণ করে নভেম্বর মাসে সৌদি তেলের দাম সামান্য বাড়তে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে এবার বড় ধরনের মূল্যছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ।
এশিয়ার জন্য বড় ছাড়
নভেম্বরের জন্য সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেড আরব লাইট ক্রুডের দাম ওমান ও দুবাইয়ের গড় দামের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার কম নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মাসের তুলনায় এটি ৩ ডলার কম। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনের পর এশীয় ক্রেতাদের জন্য এটিই সৌদি তেলের সবচেয়ে বড় মূল্যছাড়।
শুধু আরব লাইট নয়, আরব মিডিয়াম ও আরব হেভি—এশিয়ার বাজারে বিক্রি হওয়া অন্য দুই গুরুত্বপূর্ণ গ্রেডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার কমিয়েছে সৌদি আরামকো।
কেন এই মূল্যছাড়?
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতাদের ধরে রাখতেই সৌদি আরব এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এশীয় ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে তেলবাহী ট্যাংকারের ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে শুধু তেলের দাম নয়, পরিবহন ব্যয়ও ক্রেতাদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের মূল্যছাড়কে তাই ক্রেতাদের সেই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের একটি অংশ পুষিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা এশিয়ার তেল আমদানিকারকদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম দামে সৌদি তেল সরবরাহ করে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে রিয়াদ।
ইউরোপে আবার ভিন্ন চিত্র
তবে এশিয়ার জন্য সৌদি আরবের এই বড় মূল্যছাড়ের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে। নভেম্বর মাসের জন্য উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে সব ধরনের সৌদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নভেম্বরের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারের জন্য ভিন্ন মূল্যনীতি অনুসরণ করছে সৌদি আরামকো।
এশিয়ার বাজার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ভোক্তা অঞ্চল এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। ফলে এশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি পরিবহনের বাড়তি খরচ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে সৌদি আরবের এই মূল্যছাড় শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি এশিয়ার তেলবাজারে নিজেদের প্রভাব ও বাজার অংশীদারিত্ব ধরে রাখার একটি কৌশলও হতে পারে।
নভেম্বরে এই নতুন মূল্য কাঠামো কার্যকর হলে এশিয়ার তেল আমদানিকারকদের ওপর তার প্রভাব যেমন পড়বে, তেমনি বিশ্ববাজারে সৌদি আরবের পরবর্তী মূল্যনীতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।



