৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বিনোদন

ইনফ্লুয়েন্সার হত্যার নৃশংস বর্ণনা আদালতে: মাথা সেদ্ধ করে বানানো হয় স্যুপ, খণ্ডিত পা ছিল ফ্রিজে

1761a96dd7e6b46842f76447c284777c-6ac09101a7f37

হংকংয়ের ধনকুবের মডেল ও ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাবি চোইকে হত্যার পর মাংস কাটার মতো খণ্ডবিখণ্ড করে সবজির সুপের পাত্রে মাথার খুলি রান্না করার নৃশংস বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে আদালতে। নিজের কেনা বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাট বিক্রির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে বিরোধের জেরে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে চাঞ্চল্যকর এই মামলার শুনানিতে সরকারপক্ষ অভিযোগ করেছে।

বুধবার হংকংয়ের হাইকোর্টে শুরু হওয়া বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার শুনানিতে উপস্থিত হন অভিযুক্তরা। অ্যাবি চোইকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তার সাবেক শ্বশুর কাও কুয়াং, সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কুয়াং এবং সাবেক দেবর অ্যান্থনি কুয়াং আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। আট সপ্তাহব্যাপী চলার সম্ভাবনা থাকা এই বিচারপ্রক্রিয়ায় সরকারপক্ষের কৌঁসুলিরা অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে বিস্তারিত তথ্য ও অভিযোগ তুলে ধরছেন।

আদালতে প্রসিকিউটর শার্লট ড্রেকট এসসি জানান, হো মান তিনের কাদুড়িয়া আবাসিক এলাকায় অবস্থিত অ্যাবির একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ হংকং ডলার (৬৯ লাখ পাউন্ড) মূল্যের ওই ফ্ল্যাটটি ২০২২ সালে বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন অ্যাবি। ২০১৯ সালে তিনি ফ্ল্যাটটি প্রায় ৬ কোটি হংকং ডলারে কিনেছিলেন, যা বাজারমূল্যের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম ছিল। উদ্দেশ্য ছিল কাউলুন তংয়ে অ্যাবির নিজের বাড়ির কাছাকাছি যেন তার সাবেক স্বামী অ্যালেক্সের দুই সন্তানকে তাদের দাদা-দাদি দেখাশোনা করতে পারেন।

একাধিক সম্পত্তি থাকলে আরোপিত হওয়া বিপুল অঙ্কের স্ট্যাম্প ডিউটি এড়াতে তিনি কৌশলগতভাবে ফ্ল্যাটটি সাবেক শ্বশুর কাও কুয়াংয়ের নামে নিবন্ধন করিয়েছিলেন। প্রসিকিউশন স্পষ্ট করে বলেছে, ফ্ল্যাটটি অন্যের নামে নথিভুক্ত করার এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে অ্যাবির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং তার মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনে।

একপর্যায়ে সন্তান ও নিজের মধ্যে দূরত্ব তৈরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে শ্বশুর কাও কুয়াংকে ওই ফ্ল্যাট থেকে উচ্ছেদ করেন অ্যাবি। এরপর শেউং মান কোর্টে একটি এক কক্ষের ফ্ল্যাটে বড় ছেলের সঙ্গে বাধ্য হয়ে বসবাস শুরু করেন শ্বশুর। নিজের বাস করা বাড়িটি হাতছাড়া হওয়ার ক্ষোভ ও তীব্র আক্রোশ থেকে কাও কুয়াং তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাবিকে হত্যার চূড়ান্ত ছক তৈরি করেন, যাতে তিনি ফ্ল্যাটটির মালিকানা ধরে রাখতে পারেন।

Advertisements

আদালতে শুনানির সময় মাকে পাঠানো অ্যাবির কিছু ব্যক্তিগত অডিও বার্তা বাজিয়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অত্যন্ত অপ্রীতিকর আচরণকারী ও সাবেক শ্বশুরকে একজন প্রতারক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের প্রতি অতীতে উদারতা দেখানোর কারণে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন। একটি বার্তায় অ্যাবি বলেন, ‘ওই ফ্ল্যাটের পেছনে বিপুল অর্থ ঢালা হয়েছে এবং তা শুধুই তাদের জন্য করা হয়েছে। সত্যি বলতে, আমার দুটি সন্তানের ভবিষ্যতের স্বার্থে এবং আমার ভালো মানসিকতার কারণেই তারা এত সুন্দর একটা জীবন পেয়েছে। এত বছর আগে ছেলের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পরও আমি তাদের ছেলের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা জুগিয়ে গেছি। এরপরও তারা এমন অকৃতজ্ঞ আচরণ করছে।’

শুনানিতে প্রসিকিউটর ড্রেকট নয় সদস্যের জুরিবোর্ডকে জানান, অ্যাবির নিজের পরিবার সম্পদশালী ছিল এবং তার দ্বিতীয় জীবনসঙ্গী ক্রিস তামের পরিবারও অত্যন্ত বিত্তশালী। বিপরীতে কুয়াং পরিবার একেবারেই সচ্ছল ছিল না। এই আর্থিক বৈষম্য ও অর্থলোভই পুরো হত্যাকাণ্ডের মূল শিকড় হিসেবে কাজ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনায় তিন আসামির প্রত্যেকেরই সুস্পষ্ট ভূমিকা ছিল; যার মধ্যে নির্জন ফ্ল্যাট ভাড়া করা থেকে শুরু করে অ্যাবিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আসামিরা দলবদ্ধভাবে এই অপরাধ ঘটিয়েছে, ফলে সরাসরি কে আঘাত করেছে তা নয়, বরং প্রত্যেকেই সমানভাবে এই হত্যাকাণ্ডে দায়বদ্ধ।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন ২৮ বছর বয়সী ফ্যাশন আইকন অ্যাবি চোই। নিখোঁজের তিন দিন পর হংকংয়ের তাই পো এলাকার একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে তার দেহাংশের সন্ধান মেলে, যা কার্যত একটি অস্থায়ী কসাইখানায় রূপান্তর করা হয়েছিল। পুলিশ ওই ফ্ল্যাট থেকে একটি মাংস কাটার যন্ত্র (মিট স্লাইসার), বৈদ্যুতিক করাত এবং রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করে। সেখানে গাজর ও অন্যান্য সবজি ভর্তি একটি বড় পাত্রে অ্যাবির সেদ্ধ মাথার খুলি পাওয়া যায় এবং ফ্ল্যাটের ফ্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয় তার বিচ্ছিন্ন দুটি পা। তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা অ্যালান চুং জানিয়েছিলেন, শরীরের কিছু অংশ গোপন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। দেয়াল যেন রক্তে না ভেজে সেজন্য আসামিরা পলিথিন বা ত্রিপল টানিয়ে রেখেছিল এবং অঙ্গচ্ছেদ করার সময় রক্ত থেকে বাঁচতে মুখে ফেস শিল্ড ও শরীরে রেইনকোট পরিধান করেছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে ধনী পরিবার থেকে উঠে আসা অ্যাবি মাত্র ১৮ বছর বয়সে অ্যালেক্স কুয়াংকে বিয়ে করেন এবং তাদের সংসারে দুটি সন্তানের জন্ম হয়। বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও তিনি সাবেক স্বামীর পুরো পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সঙ্গীর সঙ্গেও তার দুটি সন্তান হয়। ফ্যাশন দুনিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মডেল নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্ল্যামারাস ফটোশুট ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোর নানা দৃশ্য তুলে ধরতেন; মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও প্যারিস ফ্যাশন উইকে ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের একটি জমকালো আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোড়ন তোলা এ হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ অব্যাহত রয়েছে এবং শুক্রবার প্রসিকিউশনের পরবর্তী যুক্তি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

Advertisements