৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

অবিবাহিত নারী বিদেশে যেতে পারবেন না- এমন নিয়ম কি সত্যিই আছে?

24143622-gettyimages-1572191897_cover_1600x1000

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। হাতে বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা ও ভ্রমণের সব কাগজপত্র। গন্তব্য বিদেশ। তবু বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে তাঁকে শুনতে হলো—‘বাসায় জানে?’, ‘অবিবাহিত হয়ে একা যাচ্ছেন কেন?’

প্রশ্নগুলো শুনতে যতটা ব্যক্তিগত, পরিস্থিতিটা তার চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর। কারণ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশভ্রমণের অধিকার কি তাঁর বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা?

সম্প্রতি নেপাল ভ্রমণে যাওয়ার সময় তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বাধার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা কেন অবিবাহিত অবস্থায় নিজেরা বিদেশে যাচ্ছেন এবং পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানেন কি না—এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁদের ভ্রমণ নিয়েই তৈরি হয় জটিলতা।

ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—একজন নারীর বিদেশযাত্রা নিয়ে ইমিগ্রেশনে আসলে কতটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা আইনসঙ্গত বা প্রয়োজনীয়?

বিদেশভ্রমণের ক্ষেত্রে নারীদের এমন অভিজ্ঞতার কথা মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। কখনো জানতে চাওয়া হয়, বিয়ে হয়েছে কি না। বিবাহিত হলে প্রশ্ন আসে—‘স্বামী আপনাকে একা যেতে দিলেন?’ কখনো আবার জানতে চাওয়া হয়, ‘এত টাকা কোথায় পেলেন?’ কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন কিংবা একা ভ্রমণ করবেন কি না—এসব সিদ্ধান্ত কি তাঁর বৈবাহিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল?

আইন কী বলছে?

Advertisements

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের বাংলাদেশ ত্যাগ এবং দেশে পুনঃপ্রবেশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অবশ্যই আইন অনুযায়ী যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের নীতি এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩ অনুযায়ী বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ছাড়া দেশ ত্যাগ করা যায় না। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট আইনগত কারণে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান, সীমিত বা বাতিল করার বিধানও রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু ‘অবিবাহিত নারী’ হওয়ার কারণে বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোনো স্বতন্ত্র বিধান কোথায়? অর্থাৎ, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা ও অন্যান্য ভ্রমণ নথি থাকার পরও কেবল তিনি অবিবাহিত—এই পরিচয় কি তাঁর বিদেশ যাওয়ার পথে বাধা হতে পারে?

নিরাপত্তা যাচাই হোক, ব্যক্তিগত জীবনের বিচার নয়

ইমিগ্রেশনের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা যাচাই করা। তাই প্রয়োজনীয় প্রশ্ন, নথি যাচাই কিংবা সন্দেহজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ—এসবের যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা যাচাই আর ব্যক্তিগত জীবনে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ—দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।

একজন পুরুষ ভ্রমণকারীর ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক, একই প্রশ্ন একজন নারীকে ঘিরে কেন হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে? একজন নারী অবিবাহিত হলে তাঁর ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের অনুমতি, স্বামীর সম্মতি কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় কেন আলোচনায় আসবে?

কয়েক বছর আগে নারী ভ্রমণকারীদের সঙ্গে ইমিগ্রেশন পুলিশের আচরণ আরও পেশাদার ও বৈষম্যহীন করার লক্ষ্যে জেন্ডার সমতা নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল ভ্রমণকন্যার সহপ্রতিষ্ঠাতা মানসী সাহার সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছিল নারী ভ্রমণকারীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন আচরণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। তবে জানা গেছে, সেই উদ্যোগটি বর্তমানে আর চালু নেই।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়

নারীর স্বাধীন চলাচল নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন সমান অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে, তখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাঁর বৈবাহিক পরিচয় কেন বারবার সামনে আসবে?

ইমিগ্রেশন অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। প্রয়োজন হলে কঠোর যাচাইও করবে। কিন্তু সেই যাচাই যেন বৈবাহিক অবস্থা, পারিবারিক অনুমতি কিংবা নারী-পুরুষের জন্য আলাদা সামাজিক মানদণ্ডের ওপর নির্ভর না করে—এটাই মূল প্রশ্ন। কারণ, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিদেশভ্রমণের অধিকার নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে তাঁর বৈবাহিক অবস্থা নয়, আইন ও বৈধ ভ্রমণ নথিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

Advertisements