২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বিবিধ

১৪ বছর ধরে ছেলের অপেক্ষায় বৃদ্ধা মা, হাতে সন্তানের ছবি

news_1789997044898

‘ছেলেটা কি আর কখনো বাড়ি ফিরবে?’—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই কেটে গেছে ১৪ বছর। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৮০ বছরের খুশিদা বেগম এখনও ছেলের ছবি বুকে আগলে দিন কাটাচ্ছেন। জীবনের শেষ সময়ে একবার ছেলেকে চোখের সামনে দেখার আকাঙ্ক্ষাই এখন তার সবচেয়ে বড় চাওয়া।

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গোহট উত্তর ইউনিয়নের তফিরা গ্রামের শহিদুল্লাহ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সৌদি আরবের দাম্মামের একটি কারাগারে বন্দি। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তার স্ত্রী পেয়ারা বেগম। একই সঙ্গে বাবা ফিরে আসবেন—এই আশায় দিন কাটছে ছেলে জিহাদ ও মেয়ে পিয়া আক্তারের।

পরিবারের কাছে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারির একটি চিঠি থেকে জানা যায়, সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় শহিদুল্লাহকে ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। সৌদি নাগরিক জাকি আল আশুরকে হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিচার শেষে শহিদুল্লাহর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে এবং রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের একটি চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি তার পরিবারকে জানানো হয়েছিল।

তবে শহিদুল্লাহর স্ত্রী ও স্বজনদের দাবি, হত্যার ঘটনায় তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক সহায়তার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

শহিদুল্লাহর স্ত্রী পেয়ারা বেগম জানান, স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরবে থাকলেও বিদেশ যাওয়ার প্রায় চার বছর পর একবার দেশে ফিরেছিলেন। ছুটি শেষে আবার সৌদি আরবে চলে যাওয়ার পরই তার জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ। এরপর আর স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সংসার করার সুযোগ হয়নি।

Advertisements

স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি সহায়তার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দিন পার করছেন বলেও জানান পেয়ারা।

শহিদুল্লাহর ছেলে জিহাদ যখন সাত-আট বছরের শিশু, তখনই বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর দেখতে দেখতে ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। শৈশব পেরিয়ে এখন তিনি যুবক। এত বছরেও বাবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি তার। বাবাকে অন্তত একবার সামনে থেকে দেখার ইচ্ছার কথা জানিয়ে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন জিহাদ।

অন্যদিকে, বৃদ্ধা মা খুশিদা বেগমের অপেক্ষারও যেন শেষ নেই। স্বজনদের ভাষ্য, ছেলের ফেরার আশায় প্রতিদিন বাড়ির পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। হাতে ছেলের ছবি নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রায়ই।

খুশিদা বেগম বলেন, ছেলে কবে দেশে ফিরবে, তা তিনি জানেন না। জীবনের শেষ সময়ে শুধু একবার ছেলেকে নিজের চোখে দেখতে চান। ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজান হোসেন ও বাচ্চু মিয়া জানান, শহিদুল্লাহ কয়েক বছর সৌদি আরবে কাজ করার পর দেশে ফিরেছিলেন। পরে আবার সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তার জীবনে এই দুর্ভোগ শুরু হয়। তাদের ভাষ্য, শহিদুল্লাহ স্বভাবগতভাবে সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন তার অনুপস্থিতিতে পরিবারটি মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি মামলার বর্তমান অবস্থা এবং শহিদুল্লাহর জন্য সম্ভাব্য আইনি সুযোগ সম্পর্কেও পরিবারকে সহায়তা করা হবে।

১৪ বছর ধরে একই অপেক্ষা—স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর জন্য, সন্তানরা বাবার জন্য আর বৃদ্ধা মা অপেক্ষা করছেন তার সন্তানের জন্য। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া খুশিদা বেগমের শেষ আকুতি একটাই—জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে অন্তত একবার যেন ছেলেকে ফিরে পান।

সূত্র: RTV

Advertisements