স্ক্রিনে ব্যস্ত শিশুরা কেন বেশি খাবার খায়?

খাবার খাওয়ার সময় শিশুদের টিভি দেখা, মোবাইল চালানো বা ট্যাবলেটে গেম খেলা অনেক পরিবারের শিশুরা নিত্যদিনের স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু খাবারের সময় স্ক্রিনে মনোযোগ দেওয়ার কারণে শিশুরা খাবারের দিকে কম মনোযোগ দিতে পারে। এতে তারা কী পরিমাণ খাবার খাচ্ছে বা কতটুকু খাচ্ছে এসব বিষয় বুঝতে পারে না।
তবে শুধু স্ক্রিন টাইমের কারণে শিশুরা বেশি খায় এভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা ঠিক না। স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন, খাবারের ধরন এবং শিশুর সামগ্রিক অভ্যাস সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের বদলে স্ক্রিনে মনোযোগ
সাধারণভাবে খাওয়ার সময় বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা কাজ করে— খাওয়ার আগে ক্ষুধার অনুভূতি, খাবার খাওয়ার সময় এর স্বাদ ও গঠন এবং খাবারের মাঝামাঝি সময়ে ধীরে ধীরে পেট ভরা বা তৃপ্তির অনুভূতি। কোনো শিশু যদি একই সময়ে কোনো অনুষ্ঠান দেখে বা গেম খেলে, তাহলে তার মনোযোগের একটি অংশ খাবার থেকে সরে গিয়ে স্ক্রিনের দিকে চলে যায়।
ফলে ক্ষুধা না থাকলেও তার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেয়ে যাওয়া সহজ হয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানটি চলতে থাকার কারণে শিশু নাস্তা খেতে বা খেতে থাকতে পারে—ক্ষুধা লাগার কারণে নয়।
তবে এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত প্রভাবটি এই সাধারণ ব্যাখ্যার চেয়ে কিছুটা জটিল। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ওপর পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাগারভিত্তিক পরিবেশে খাওয়ার সময় টেলিভিশন দেখার কারণে তাৎক্ষণিক ক্যালরি গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।

এর অর্থ এই নয় যে স্ক্রিনের সামনে বসে খাওয়া নিরাপদ। বরং এর অর্থ হলো, এই আচরণের প্রভাব ব্যক্তি, পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আচরণের ওপর নির্ভর করতে পারে।
স্ক্রিনে কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিও গেম বা টেলিভিশনের মতো স্ক্রিন ব্যবহারের সময় শিশুরা যে খাবার-নিরপেক্ষ পরিবেশে থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। খাবারের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডের প্রচারণামূলক কনটেন্ট, ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিও এবং অত্যন্ত সুস্বাদু বা আকর্ষণীয় খাবার দেখানো দৃশ্য—সবই শিশুর মনে খাবারের প্রতি আগ্রহ বা আকাঙ্ক্ষা তৈরি করার সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
খাবারের সময় স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে করা একটি systematic review-তে ৩৫টি গবেষণার মধ্যে ২৭টিতে বিজ্ঞাপন বা খাবার-সংক্রান্ত সংকেতের সঙ্গে খাবার গ্রহণ বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকেরা আরও উল্লেখ করেছেন যে মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেট নিয়ে গবেষণার প্রমাণ টেলিভিশন নিয়ে করা গবেষণার তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
নাশতার ধরন কেন গুরুত্বপূর্ণ
ধরা যাক, একটি শিশু ৩০ মিনিট কার্টুন দেখছে এবং তার পাশে এক বাটি বিস্কুট রাখা আছে। অন্যদিকে আরেকটি শিশু খাবার টেবিলে বসে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি নাশতা খাচ্ছে।
প্রথম পরিস্থিতিতে খাওয়ার কোনো স্পষ্ট শুরু বা শেষের সময় নাও থাকতে পারে। নাস্তাটি পুরো সময় হাতের কাছে থাকে এবং শিশু বুঝতে না পেরে বারবার অল্প অল্প করে খেতে থাকে—ফলে মোট কতটা খেয়ে ফেলেছে, তা তার নিজেরও খেয়াল নাও থাকতে পারে।
এটি একটি অভ্যাসে পরিণত হতে পারে
যদি কোনো শিশু প্রতিবার টেলিভিশনের সামনে বসার সময় চিপস, বিস্কুট, মিষ্টিযুক্ত পানীয় বা মিষ্টি জাতীয় খাবার পায়, তাহলে তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এই দুটি কাজের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করতে পারে। ফলে শুধু টেলিভিশনের সামনে বসা বা স্ক্রিন চালু করাই শিশুর মনে নাশতা খাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে—শারীরিকভাবে ক্ষুধা না থাকলেও।
খাবার ও নিয়মিত নাশতা টেবিলে বসে খাওয়া উচিত। খাবার শিশুর পাশে পুরো প্যাকেটসহ রেখে দেওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণে পরিবেশন করা ভালো। পানীয় হিসেবে পানি প্রধান বিকল্প হতে পারে। আর নিয়মিত অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত নাস্তার পরিবর্তে ফল, দই, উপযুক্ত পরিমাণে বাদাম ইত্যাদি স্বাস্থ্যকর বিকল্প দেওয়া যেতে পারে।



