গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা: নিয়ম আছে, প্রয়োগ কোথায়?

সকাল হলেই শহরের রাস্তায় শুরু হয় ছুটে চলা। কেউ অফিসে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে, আবার কেউ জীবিকার প্রয়োজনে ছুটছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই ছুটে চলা মানুষের ভিড়ে নারীরাও আছেন সমানতালে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই গণপরিবহনে তাঁদের পার হতে হয় একের পর এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বাসে ওঠা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নামা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই যেন থাকে অনিশ্চয়তা- সিট পাবেন কি না, নিরাপদে দাঁড়াতে পারবেন কি না, কেউ অযাচিতভাবে স্পর্শ করবে কি না, কিংবা প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে কি না।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে নারীদের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বাস। অথচ সেই বাসব্যবস্থাই অনেক সময় নারীদের জন্য স্বস্তির বদলে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংরক্ষিত সিট, কিন্তু সংরক্ষিত অধিকার কোথায়?
বাসে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি আসন রাখা থাকে। নিয়ম অনুযায়ী এসব আসন নারীদের পাশাপাশি শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময় ভিন্ন। বাসে উঠেই দেখা যায়, সংরক্ষিত আসনগুলোতে পুরুষ যাত্রী বসে আছেন। কোনো নারী এসে দাঁড়ালেও অনেকে সিট ছেড়ে দিতে আগ্রহী হন না।
‘ভাই, সিটটা ছাড়বেন?’-এই ছোট্ট অনুরোধটুকুও অনেক নারীর জন্য হয়ে ওঠে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা। কেউ অনুরোধ শুনেও না শোনার ভান করেন, কেউ আবার এমনভাবে তাকান যেন সিট চাওয়াটাই অন্যায়। প্রতিবাদ করতে গেলে কখনো শুনতে হয়, ‘আর একটু পরেই তো নামব’, ‘সবাই তো দাঁড়িয়ে আছে’, কিংবা ‘মহিলাদের জন্য আলাদা বাস আছে।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন নারীকে কেন নিজের ন্যায্য জায়গাটুকু পেতে প্রতিবার অনুরোধ করতে হবে?
বাসের ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতা
ভিড়ের বাসে নারীদের আরেক বড় সমস্যা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও যৌন হয়রানি। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শরীরের সঙ্গে শরীরের ধাক্কা লাগা গণপরিবহনে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃত স্পর্শ, শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো কিংবা সুযোগ নিয়ে হয়রানি নিছক ‘ভিড়ের সমস্যা’ নয়- এটি হয়রানি।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, অনেক নারী প্রতিবাদ করতে চাইলেও পারেন না!
আশপাশের মানুষ কী বলবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে কি না, বাস থামবে কি না- এসব ভাবতে ভাবতেই অনেক ঘটনা চেপে যেতে হয়।
ফলে হয়রানিকারী যেমন সুযোগ পায়, তেমনি ভুক্তভোগী নারীও ধীরে ধীরে শিখে যান- চুপ থাকাই হয়তো নিরাপদ।
ফিটনেসবিহীন বাস, অসহনীয় যাত্রা

নারীর ভোগান্তি শুধু সামাজিক আচরণেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবহনের অবকাঠামোগত দুর্বলতাও তাঁদের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। অনেক বাসে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, জানালা বা দরজা ঠিকমতো কাজ করে না, কোথাও ভাঙা সিট, কোথাও নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। গরমের দিনে অনেক বাসে ফ্যান চলে না। প্রচণ্ড গরমে ঠাসাঠাসি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করা বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাস থামানোর অনিয়ম। অনেক সময় নারী যাত্রীকে ওঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত বাস চালিয়ে দেওয়া হয়। সিঁড়িতে পা রাখার আগেই বাস চলতে শুরু করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য আরও কঠিন
একজন কর্মজীবী নারী হয়তো প্রতিদিন একই ভোগান্তি সহ্য করে অফিসে পৌঁছান। কিন্তু সঙ্গে যদি থাকে ছোট শিশু, পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। শিশুকে কোলে নিয়ে বাসে ওঠা, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা শিশুর জন্য একটু জায়গা চাওয়া- সবকিছুতেই তাঁকে নির্ভর করতে হয় অন্যের সদিচ্ছার ওপর।

গর্ভবতী নারী, বয়স্ক নারী কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ যাত্রীদের জন্য গণপরিবহনের এই বাস্তবতা আরও কঠিন। অথচ একটি মানবিক গণপরিবহনব্যবস্থায় তাঁদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াল নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক অধিকার।
‘নারীর জন্য’ নয়, সবার জন্য নিরাপদ পরিবহন
নারীদের গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু নারী যাত্রীর নয়। বাসচালক, সহকারী, পরিবহন মালিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ যাত্রী- সব পক্ষেরই দায়িত্ব আছে। বাসে হয়রানির অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। চালক ও সহকারীদের আচরণ ও দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বাসের ভেতর পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ দরজা, চলাচলের উপযোগী সিঁড়ি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সংরক্ষিত আসনের নিয়ম বাস্তবায়নেও কঠোরতা প্রয়োজন। তবে সবকিছুর আগে বদলাতে হবে আমাদের সামাজিক মানসিকতা। কোনো নারী প্রতিবাদ করলে তাঁকেই ‘বেশি কথা বলা’ বা ‘বাড়াবাড়ি করা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একজন নারী বাসে নিরাপদে দাঁড়াতে চাইলে, নিজের নির্ধারিত সিটে বসতে চাইলে কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের প্রতিবাদ করলে তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না- তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তাটুকুই চাইছেন।
একটি শহর কতটা আধুনিক, তা শুধু তার উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা চকচকে বাস দেখে বোঝা যায় না। সেই শহরের গণপরিবহনে একজন নারী কতটা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদা নিয়ে চলতে পারেন- সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
দিন শেষে একজন নারী যেন বাসে ওঠার আগে মনে মনে প্রস্তুতি না নেন-‘আজ কী কী সহ্য করতে হবে?’ বরং তাঁর ভাবনা হওয়া উচিত-‘নিরাপদেই তো পৌঁছে যাব।’ বাংলাদেশের গণপরিবহনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো সেদিনই হবে, যেদিন এই সাধারণ প্রত্যাশাটুকু আর কোনো নারীর কাছে বিলাসিতা মনে হবে না।



