বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

সাত বছরের মধ্যে এই জুনই সবচেয়ে শুষ্ক, বৃষ্টি কম ২৯ শতাংশ

সাত বছরের মধ্যে এই জুনই সবচেয়ে শুষ্ক, বৃষ্টি কম ২৯ শতাংশ

বাংলাদেশে জুন মাস মানেই বর্ষার শুরু। সাধারণত এ সময় নদী-নালা, খাল-বিল বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে এবং কৃষকেরা আমন ধানের চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে সদ্য শেষ হওয়া জুন মাস সেই চেনা চিত্র থেকে ছিল অনেকটাই ভিন্ন। এবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে জুন মাসে সর্বনিম্ন।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি মাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে মে ও জুন মাসে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে উষ্ণ ও শুষ্ক দিনের সংখ্যা। ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সাত বছরে এই জুনেই সবচেয়ে কম বৃষ্টি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ ও ২০২১ সালে জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২১ সালে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে শুরু করে। গত বছর জুনে বৃষ্টি ছিল ২১ শতাংশ কম, আর চলতি বছর সেই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ শতাংশে।
বাংলাদেশে জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেও জুন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টির মাস হিসেবে পরিচিত। তাই এই সময়ে বৃষ্টির এমন ঘাটতি বিশেষভাবে উদ্বেগের বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা।

Advertisements

বাড়ছে তাপমাত্রা, দীর্ঘ হচ্ছে গরমের সময়

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছরই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টিতে এই বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। জুন মাসে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতিবছরই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বর্ষার শুরুতেও গরমের তীব্রতা কমছে না।
এ ছাড়া গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি দশকে দেশে উষ্ণ দিনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিহীন বা শুষ্ক দিনও বাড়ছে। ফলে গরম শুধু তীব্রই হচ্ছে না, এর স্থায়িত্বও দীর্ঘ হচ্ছে।

জুনেই সবচেয়ে বেশি তাপজনিত অস্বস্তি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রাও মানুষের শরীরে গরমের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাপজনিত অস্বস্তির মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এর মধ্যে জুন মাসেই মানুষের শরীরে গরমের চাপ সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক বছরে এই তাপজনিত অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।

কৃষি ও অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

জুনে বৃষ্টি কম হওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় কৃষকদের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি খাল-বিল, জলাধার ও ছোট নদীগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহও কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জুলাই মাসেও বৃষ্টির ঘাটতি অব্যাহত থাকে, তাহলে আমন ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময়ের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া শহরাঞ্চলেও নানা সমস্যা তৈরি করছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, শ্রমঘণ্টা কমে যাচ্ছে এবং শিশু, বয়স্ক ও বাইরে কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত

আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য, একটি মাসে কম বৃষ্টি হওয়াকে এককভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ বলা যায় না। তবে কয়েক বছর ধরে জুনে বৃষ্টির ঘাটতি বাড়া, একই সময়ে তাপমাত্রা ও উষ্ণ দিনের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া—এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের জলবায়ু যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। তাই বছরের বাকি সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি কী হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জলবায়ুর জন্য কতটা ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে।

Advertisements
আবহাওয়াজুনতাপমাত্রাশুষ্ক