বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
বিনোদন

‘রইদ’-এর সবচেয়ে বড় রহস্য কি সাদুর বউ?

resize-600x315x0x0-image_5700_1776231117

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন অনেক নারী চরিত্র আছে, যাদের পরিচয় তাদের নিজের নামে নয়, বরং কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ‘রইদ’-এর কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রও তেমনই একজন। তার কোনো নাম নেই। তিনি কেবল ‘সাদুর বউ’। কখনো আবার গ্রামের মানুষের কাছে ‘পাগলি’।
কিন্তু সত্যিই কি তিনি পাগলি?

পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন-এর ‘রইদ’ দেখতে দেখতে মনে হয়, সিনেমাটির সবচেয়ে জটিল চরিত্র সাদু নয়, বরং এই নামহীন নারী। যে নারীকে সমাজ কখনো বোঝার চেষ্টা করেনি, শুধু বিচার করেছে।
ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারানো, মামার বাড়িতে বড় হওয়া, অল্প বয়সে জোরপূর্বক বিয়ের অভিজ্ঞতা—একটি মানুষের মানসিক জগৎকে ভেঙে দেওয়ার জন্য এই ঘটনাগুলোই যথেষ্ট। সাদুর বউয়ের আচরণকে তাই যদি কেউ অস্বাভাবিক মনে করে, তাহলে তার পেছনের ক্ষতগুলোকেও দেখা প্রয়োজন। তিনি সমাজের নিয়ম মানতে পারেন না, কারণ সমাজ কখনো তার জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করেনি।

জন্মের পর থেকেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করছে অন্যরা। কখন তাকে বিয়ে দেওয়া হবে, কোথায় থাকতে হবে, কখন তাকে ত্যাগ করা হবে—সব সিদ্ধান্ত নেয় পুরুষেরা। এমনকি সাদুও, যে একসময় তাকে জঙ্গলে ফেলে আসে, আবার নিজের প্রয়োজনেই তাকে ফিরে পেতে চায়।
এই জায়গাটিই ‘রইদ’-কে কেবল একটি প্রেমের গল্প বা গ্রামীণ জীবনের গল্প হতে দেয় না। এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার গল্প।

এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে একজন নারীর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু কণ্ঠস্বর নেই।
সাদু যখন স্ত্রীকে জঙ্গলে ফেলে আসে, তখন আমরা তার কষ্ট দেখি। কিন্তু খুব কমই ভাবি, সেই নারীটির অনুভূতি কী ছিল? যে জানে না কেন তাকে ত্যাগ করা হলো, কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে। তবুও সে ফিরে আসে। কারণ ভালোবাসা নয়, অনেক সময় মানুষের ফিরে আসার কারণ হয় নিঃসঙ্গতা। হয়তো সে-ও একজন সঙ্গী খুঁজছিল।
সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তগুলোর একটি আসে শেষদিকে। যখন সাদু জানতে পারে, তার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান এসেছে। তখন প্রশ্ন ওঠে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে।

Advertisements

সাদু সরাসরি জিজ্ঞেস করে, কিন্তু পরিচালক কোনো সরাসরি উত্তর দেন না। ক্যামেরা স্থির হয়ে থাকে নারীর মুখে। তার চোখে।
সেই নীরবতাই যেন পুরো সিনেমার ভাষা।
দর্শক চাইলে সেই দৃষ্টিতে অপরাধবোধ খুঁজে নিতে পারেন, আবার অপমানও দেখতে পারেন। কেউ হয়তো দেখবেন দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ। উত্তর যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রথমবারের মতো পরিচালক ব্যাখ্যার ক্ষমতাটা দর্শকের হাতে নয়, নারীর নীরবতার হাতে তুলে দেন।


তবে এই শক্তিই আবার সিনেমাটির সীমাবদ্ধতা। প্রতীক, রূপক ও নীরবতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ দর্শকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। অনেকেই গল্পের আবেগের চেয়ে তার ব্যাখ্যা নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে সাদুর বউয়ের যন্ত্রণা অনুভব করার বদলে, দর্শক তার অর্থ খুঁজতে থাকেন।
তবুও ‘রইদ’ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এমন এক নারীর গল্প বলে, যাকে সবাই ‘পাগলি’ বলে ডাকে, অথচ যার ভেতরে লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বেশি মানবিকতা, সবচেয়ে বেশি একাকীত্ব।

Advertisements
চলচ্চিত্রনারীরহস্যসাদু