বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

শ্রমে সমান, মজুরিতে অর্ধেক: নারীরা কেন পিছিয়ে?

WhatsApp Image 2026-05-30 at 9.08.18 AM

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে রিনা খাতুনের। সংসারের কাজ গুছিয়ে সকাল সাতটার মধ্যে পৌঁছে যান কাঁকড়ার খামারে। সারাদিন কাঁকড়াকে খাবার দেওয়া, খোলস পরিষ্কার, বাছাই- একটানা পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন তিনি। কিন্তু মাস শেষে বেতন হাতে পেলেই বোঝেন, তার শ্রমের মূল্য পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে কম। একই কাজ করেও যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক পান নয় হাজার টাকা, সেখানে রিনার বেতন সাড়ে সাত হাজারে আটকে থাকে।

শুধু রিনা নন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন শ্রমঘন খাতে এমন অসংখ্য নারী প্রতিদিন সমান কাজ করেও কম মজুরি পাচ্ছেন। আইনে সমঅধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় নারীদের শ্রমের মূল্য যেন এখনো কম। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩৪৫ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে- একই প্রকৃতির বা সমমূল্যের কাজের জন্য নারী ও পুরুষকে সমান মজুরি দিতে হবে। ২০০৬ সালে পাস হওয়া এই আইন শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্য নিয়েই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পরও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

জলবায়ু পরিবর্তনের সুযোগে গড়ে ওঠা নতুন শিল্পেও পুরোনো বৈষম্য

উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়েছে, বদলে গেছে কৃষির ধরন। সেই পরিবর্তনের সুযোগে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে সফটশেল কাঁকড়া চাষ। এই শিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। সেখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়।

খামারে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে কাজ করছেন। কাঁকড়ার পরিচর্যা থেকে শুরু করে পরিষ্কার, বাছাই, শেল সংগ্রহ—সব কাজেই তাদের দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু মজুরি নির্ধারণে দেখা যায় পুরোনো বৈষম্যের ছাপ। একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ টাকা পান, সেখানে নারী শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। অথচ কাজের ধরনে কোনও পার্থক্য নেই। শ্যামনগরের নারী শ্রমিক মর্জিনা বেগম বলেন, “ধান কাটার কাজে পুরুষের চেয়ে আমি কম পরিশ্রম করি না। তবুও একবেলা কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিক ৮০০ টাকা পায়, আমি পাই ৫০০। কাজ তো একই, তাহলে পার্থক্য কেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে সমাজের গভীরে প্রোথিত লিঙ্গবৈষম্যের চিত্র।

‘নারীর আয় অতিরিক্ত’- পুরোনো ধারণাই বড় বাধা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের সমাজে এখনো একটি ধারণা প্রবল—পুরুষই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, নারীর আয় কেবল সহায়ক। ফলে কর্মক্ষেত্রেও নারীর শ্রমকে অনেক সময় ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতার সুযোগ নিয়েই অনেক মালিক নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেন। আবার অনেক নারী নিজের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন নন। দরিদ্রতা, কাজ হারানোর ভয় এবং সামাজিক চাপের কারণে তারা প্রতিবাদও করতে পারেন না। রাস্তার ইট ভাঙার কাজ করা আলেয়া বেগম প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে একই পরিমাণ শ্রম দেন। কিন্তু দিনের শেষে মজুরির খামে তার ভাগ কম। তার স্বামী কামরুল মল্লিক বলেন, “আমরা দুজন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একই কাজ করি। কিন্তু আমার স্ত্রী ২০০ টাকা কম পায়। এটা অন্যায় ছাড়া কিছু নয়।” এই অন্যায় শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়; এটি নারীর মর্যাদা ও শ্রমের স্বীকৃতির প্রশ্নও।

অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে, অধিকার নয়

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কৃষি, গার্মেন্টস, মৎস্য, ইটভাটা, নির্মাণ- প্রায় সব খাতেই নারীরা কাজ করছেন। পরিবার চালানো থেকে সন্তানদের পড়াশোনা—সব ক্ষেত্রেই তাদের আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, শ্রমবাজারে নারীরা এখনো সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। কম মজুরি ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অভাব এবং কর্মঘণ্টার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

উপকূলে নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিসিডিবির শ্যামনগর উপজেলা কো-অর্ডিনেটর স্টিভ রায় রূপন বলেন, “সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার। এই বৈষম্য দূর করতে সামাজিক আন্দোলন জরুরি।” তার মতে, স্থানীয় প্রশাসন, খামারমালিক এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও বাধা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। কারণ, কম মজুরি মানে নারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, পরিবারের পুষ্টি ও শিক্ষায় প্রভাব পড়া এবং দারিদ্র্যের চক্র দীর্ঘস্থায়ী হওয়া।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো লিঙ্গসমতা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য থাকলে সেই লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে।

জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার জানিয়েছেন, শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও সামাজিক পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈষম্য দূর করতে হলে প্রথমেই শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা।

বড় বিষয় হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। নারীর শ্রমকে ‘সহায়ক’ নয়, সমান মূল্যবান হিসেবে দেখতে শিখতে হবে সমাজকে। কারণ, একজন নারী যখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই ঘাম ঝরান, তখন তার শ্রমের মূল্য কম হওয়ার কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।

সমান কাজের জন্য সমান মজুরি শুধু আইনের ভাষা নয়- এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, মানবাধিকারের প্রশ্ন, আর একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার পূর্বশর্ত।

নারীবৈষম্যমজুরিশ্রমে