বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

গরম, চাপ ও সহিংসতা: নারী ও শিশু নির্যাতন কি সত্যিই মৌসুমি?

নির্যাতন

গরমের সময় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ে—এই দাবি প্রথম শুনলে অনেকের কাছেই এটি কাকতালীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা মিলিয়ে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় সহিংসতা শুধু সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়, পরিবেশগত কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে মানুষের আচরণে পরিবর্তন আসে—এটি এখন আর শুধু ধারণা নয়, বরং গবেষণায় সমর্থিত একটি বাস্তবতা।

তাপমাত্রা কি সত্যিই আচরণ বদলায়?

২০২৩ সালের এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সঙ্গীর প্রতি সহিংসতা প্রায় ৪.৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গরমের সময় শারীরিক ও যৌন সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

এর পেছনে প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে গবেষকরা বলছেন—শারীরিক অস্বস্তি, ঘুমের ঘাটতি, এবং মানসিক অস্থিরতা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, তাপমাত্রা সরাসরি সহিংসতা তৈরি না করলেও সহিংসতার ‘ঝুঁকি পরিবেশ’ তৈরি করে।

বাংলাদেশের চিত্র: মৌসুমি প্যাটার্ন

বাংলাদেশ পুলিশের কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন দেখা যায়। মার্চ-এপ্রিল থেকে মামলা বাড়তে শুরু করে, গরম ও বর্ষাকালে তা বেশি থাকে এবং শীতকালে তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ২০২১ সালের জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, আবার শীতের সময় তা অনেকটাই কমে যায়। এই প্রবণতা একাধিক বছর ধরেই প্রায় একই রকম।

এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি মৌসুমি প্রভাবের অংশ হতে পারে।

শুধু আবহাওয়া নয়, চাপের বহুমাত্রিক বাস্তবতা

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—গরমকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একটি ‘ট্রিগার ফ্যাক্টর’, যা আগেই থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বাংলাদেশে গরমের সময়—

১।  নির্মাণ শ্রম, কৃষিকাজ ও দৈনিক আয়ের কাজ কমে যায়

২।  বিদ্যুৎ সংকট ও ঘুমের সমস্যা বাড়ে

৩।  শহরে ভিড় ও অস্বস্তি বাড়ে

এই সব মিলিয়ে পরিবারে আর্থিক ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। আর এই চাপ অনেক সময় পারিবারিক সহিংসতায় রূপ নেয়।

সমস্যার গভীরে: কাঠামোগত বাস্তবতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতনের এই মৌসুমি প্রবণতা শুধু আবহাওয়ার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে—

১।  বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা

২।  সামাজিক সচেতনতার অভাব

৩।  ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি

৪।  শহরে দুর্বল সামাজিক নজরদারি

এগুলো মিলেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে চাপের মুহূর্তে সহিংসতা সহজে ঘটে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গরম নিজে সহিংসতা তৈরি করে না, কিন্তু সহিংসতার সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি শক্তিশালী পরিবেশ তৈরি করে। এটি শরীর, মন এবং অর্থনৈতিক জীবনের ওপর একসঙ্গে চাপ ফেলে।

তথ্যসূত্র: টিবিএস

গরমনারীনির্যাতনশিশুসহিংসতা