বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

মনের পশুকে কোরবানি করেছেন তো?

WhatsApp Image 2026-05-28 at 5.55.36 PM

কোরবানির ঈদ এলেই চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। পশুর হাট, দরদাম, প্রস্তুতি, মাংস ভাগাভাগি-সব মিলিয়ে যেন এক ব্যস্ত আয়োজন। কিন্তু এত আয়োজনের ভিড়ে আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা কী? কেবল পশু জবাই করলেই কি কোরবানি পূর্ণ হয়, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো বার্তা লুকিয়ে আছে?

ইসলামে কোরবানির মূল শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ। নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা, অহংকার, ক্রোধ, স্বার্থপরতা- এই নেতিবাচক প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করার শিক্ষা দেয় কোরবানি। অর্থাৎ শুধু পশু নয়, কোরবানি দিতে হয় মনের পশুকেও।

আমাদের সমাজে আজ প্রযুক্তি বেড়েছে, উন্নয়ন হয়েছে, বাহ্যিক চাকচিক্যও বেড়েছে অনেক। কিন্তু মানুষের ভেতরের মানবিকতা কি সমানভাবে বেড়েছে? পরিবারে পরিবারে দূরত্ব বাড়ছে, সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। সামান্য বিষয় নিয়ে রাগ, হিংসা, প্রতিশোধ কিংবা অহংকারের আগুনে পুড়ছে মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে ছোট করা, বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা অকারণে কষ্ট দেওয়া যেন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

কোরবানির ঈদ আমাদের সেই ভেতরের অমানবিক প্রবৃত্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রশ্ন করে- আমরা কি সত্যিই নিজেদের বদলাতে পেরেছি?

একজন মানুষ হয়তো লাখ টাকার পশু কোরবানি দিলেন, কিন্তু তাঁর ভেতরে যদি অহংকার থেকেই যায়, তাহলে সেই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়? কেউ হয়তো দরিদ্র প্রতিবেশীর দিকে ফিরেও তাকান না, আত্মীয়দের সঙ্গে বছরের পর বছর সম্পর্ক রাখেন না, অথচ ঈদের দিন সামাজিক মাধ্যমে নিজের কোরবানির ছবি দেখিয়ে বাহবা কুড়াতে ব্যস্ত থাকেন। কোরবানির শিক্ষা কি এটা?

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। অর্থাৎ কোরবানির মূল বিষয়টাই হচ্ছে আত্মশুদ্ধি। নিজের ভেতরের খারাপ দিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।

আমাদের প্রত্যেকের মনেই এক ধরনের পশু বাস করে। কারও মধ্যে সেটা লোভ হয়ে থাকে, কারও মধ্যে অহংকার, কারও মধ্যে হিংসা কিংবা প্রতারণা। কেউ অন্যের সফলতা সহ্য করতে পারেন না, কেউ ক্ষমা করতে জানেন না, কেউ আবার সামান্য ক্ষমতা পেয়েই মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করেন। এই প্রবৃত্তিগুলোই মানুষের আসল শত্রু।

কোরবানি আমাদের শেখায়, মানুষ হিসেবে নিজেকে আরও বিনয়ী, আরও সহানুভূতিশীল ও আরও মানবিক করে গড়ে তুলতে। শুধু নতুন পোশাক বা ভালো খাবারে ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত আনন্দ তখনই আসে, যখন একজন মানুষ নিজের ভেতরেও পরিবর্তন আনতে পারেন।

এই ঈদে হয়তো আমরা অনেকেই পশু কোরবানি দেব। কিন্তু তার পাশাপাশি যদি একটি অহংকার কমাতে পারি, কারও প্রতি জমে থাকা ঘৃণা ভুলে যেতে পারি, কোনো অভিমান মিটিয়ে ফেলতে পারি কিংবা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি- সেটাও হবে এক ধরনের কোরবানি।

অনেক সময় আমরা ধর্মীয় আচার পালন করি ঠিকই, কিন্তু তার শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করি না। অথচ কোরবানির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই- এটি মানুষকে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। নিজের ভুলগুলো বুঝতে শেখায়। মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো মানবিকতা।

আজকের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র- সব জায়গাতেই বাড়ছে বিভাজন আর অস্থিরতা। এই সময়ে কোরবানির শিক্ষা হতে পারে আত্মশুদ্ধির এক বড় উপলক্ষ।

তাই কোরবানির ঈদে শুধু পশু জবাই করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। প্রয়োজন নিজের ভেতরের পশুত্বকে চিনে নেওয়া। সেই হিংসা, লোভ, রাগ, অহংকার আর স্বার্থপরতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত কোরবানি তখনই পূর্ণ হয়, যখন বদলে যায় মানুষের মনও।
এই ঈদে তাই প্রশ্নটা নিজেকেই করা যাক-
“মনের পশুকে কোরবানি করেছেন তো?

আত্মত্যাগঈদকোরবানিমনের পশুলোভ