বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ঈদে নাড়ির টানে ঘরে ফেরা নারীরা গণপরিবহনে কতটুকু নিরাপদ ?

WhatsApp Image 2026-05-24 at 2.41.55 PM

ঈদ মানেই নাড়ির টানে ঘরে ফেরা। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখো মানুষ ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ- সব ধরনের গণপরিবহনে এ সময় বাড়তি চাপ তৈরি হয়। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা অনেক নারীর জন্য হয়ে ওঠে উদ্বেগ, অস্বস্তি এমনকি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কারণ।

ভিড়ের সুযোগে যৌন হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, কটূক্তি, চুরি কিংবা নিরাপত্তাহীনতা- এসব ঘটনা ঈদযাত্রায় নারীদের জন্য প্রায় নিত্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আইন থাকলেও সচেতনতা, নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।

ঈদের সময় বাস ও ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়। অনেক সময় নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনও দখল হয়ে যায়। দাঁড়িয়ে বা গাদাগাদি করে যাতায়াতের সময় কিছু অসাধু ব্যক্তি সুযোগ নেয়। ইচ্ছাকৃত ধাক্কা, শরীরে হাত দেওয়া, অশ্লীল মন্তব্য কিংবা গোপনে ভিডিও ধারণের মতো ঘটনাও ঘটে। অনেক নারী লজ্জা, ভয় কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে প্রতিবাদ করেন না। কেউ কেউ অভিযোগ করলেও তা গুরুত্ব পায় না। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী জানান, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় বাসে পাশের এক ব্যক্তি বারবার অস্বস্তিকর আচরণ করছিলেন। প্রতিবাদ করার পরও আশপাশের কেউ এগিয়ে আসেননি। বরং অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। অনেক নারী একা ভ্রমণে ভয় পান। পরিবারের সদস্য ছাড়া দূরে যেতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিশেষ করে রাতের যাত্রা নারীদের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বারবার এমন অভিজ্ঞতা নারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। তারা জনসমাগম এড়িয়ে চলতে চান, যা সামাজিক ও পেশাগত জীবনেও প্রভাব ফেলে। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারী নন, শিশু ও কিশোরীরাও ঈদযাত্রায় নানা ধরনের ঝুঁকিতে থাকে। অতিরিক্ত ভিড়ে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা যেমন ঘটে, তেমনি শিশু নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আসে। তাই অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে গণপরিবহনে নারীবান্ধব পরিবেশ এখনো পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ বাসে সিসিটিভি নেই, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই এবং চালক-হেলপারদের আচরণও অনেক সময় অসৌজন্যমূলক হয়। লঞ্চঘাট কিংবা বাস টার্মিনালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় নারীরা আরও ঝুঁকিতে পড়েন। এ ছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহন, টিকিটের অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। অনেক নারী বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিভিন্ন আইনে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বাস্তবে অভিযোগ প্রমাণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ ও বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিতে চান না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না; দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনে নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও যাত্রী- সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

নারীর নিরাপদ যাত্রায় কী করা জরুরি?

বিশেষজ্ঞরা ঈদযাত্রায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন-

  • গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন
  • নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা সহায়তা ডেস্ক চালু
  • বাস ও ট্রেনে নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধি
  • চালক ও হেলপারদের আচরণবিষয়ক প্রশিক্ষণ
  • দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • টার্মিনাল ও স্টেশন এলাকায় পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
  • যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীর নিরাপত্তা শুধু নারীর দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। গণপরিবহনে কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে আশপাশের মানুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। নীরবতা অপরাধীদের সাহস বাড়ায়।

ঈদ আনন্দের উৎসব। এই আনন্দযাত্রা যেন কোনো নারীর জন্য আতঙ্কের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। নিরাপদ গণপরিবহন শুধু নারীর অধিকার নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের পরিচয়ও বটে।

ঈদগণপরিবহননারীনিরাপদ