বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
বিনোদন

‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’-এক লড়াকু নারীর গল্প

7488a0b0-4303-11f1-8f44-65d2172cbb44.jpg (1)

পৃথিবীতে এমন কিছু অসাধারণ নারী আছেন, যাদের গল্প শুনলে বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হয়। বিশেষ করে সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত অপরাধ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রগুলো (ট্রু ক্রাইম ডকুমেন্টারি) দেখলে বোঝা যায়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা নিষ্ঠুরতা সহ্য করেও নারীরা কীভাবে লড়াই চালিয়ে যান। নেটফ্লিক্সের তিন পর্বের নতুন ডকুসিরিজ ‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’ (Should I Marry a Murderer?) এমনই এক অদম্য নারী ক্যারোলিন মুয়ারহেডের গল্প বলছে। নিজের হবু স্বামী যে একজন খুনি, তা জানার পর পুলিশকে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান মিলেছে চরম অবহেলা আর উদাসীনতায়।

২৯ বছর বয়সী প্যাথলজিস্ট ক্যারোলিন ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারের মাধ্যমে প্রেমে পড়েন স্কটিশ কৃষক স্যান্ডি ম্যাককেলারের। একটি ভাঙা সম্পর্কের বিষাদ কাটিয়ে স্যান্ডির মাঝে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। স্যান্ডি দেখতে সুদর্শন, মিশুক এবং ক্যারোলিনের প্রতি দারুণ অনুরাগী। যদিও মাঝেমধ্যে মদ্যপ অবস্থায় স্যান্ডির আচরণ কিছুটা ‘অন্ধকার’ হয়ে উঠত এবং তার যমজ ভাই রবার্ট একবার সতর্কও করেছিলেন যে, স্যান্ডির ‘মাথা ঠিক নেই’। কিন্তু ভালোবাসার আতিশয্যে ক্যারোলিন সেসব পাত্তা দেননি। দ্রুতই তাদের বাগদান সম্পন্ন হয়। বন্ধুরা খুব একটা উৎসাহিত না হলেও ক্যারোলিন তখন ভেবেছিলেন— ‘খারাপ আর কী-ই বা হতে পারে?’

ঠিক সেই মুহূর্তেই গল্পের মোড় ঘোরে। বাগদানের পরপরই স্যান্ডি স্বীকার করেন, তিন বছর আগে তার ট্রাকের ধাক্কায় টনি পারসনস নামের এক সাইকেল আরোহী নিহত হয়েছিলেন। স্যান্ডি এবং তার ভাই রবার্ট সেই মরদেহটি একটি নির্জন জলাভূমিতে পুঁতে ফেলেছিলেন। ক্যারোলিন সব শুনে পুলিশকে জানান। কিন্তু বিশাল ওই এলাকায় মরদেহ খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব। পুলিশ তাকে অনুরোধ করে স্যান্ডির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে মরদেহের সঠিক অবস্থান বের করতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্যারোলিন তা-ই করেন। একটি ‘রেড বুল’-এর ক্যান দিয়ে তিনি মরদেহের জায়গাটি চিহ্নিত করেন। পুলিশ কথা দিয়েছিল, প্রধান সাক্ষী হিসেবে তার পরিচয় গোপন রাখা হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

স্যান্ডি ও তার ভাইকে গ্রেফতারের পর পুলিশ ক্যারোলিনকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বলে। কিন্তু ক্যারোলিন জানতেন, হুট করে সরে গেলে খুনিরা বুঝে ফেলবে যে, সে-ই পুলিশকে ধরিয়ে দিয়েছে। নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং পুলিশকে আরও তথ্য দিতে তিনি স্যান্ডির সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার এক ভয়াবহ অভিনয় শুরু করেন। এ প্রচণ্ড মানসিক চাপে তিনি মদ্যপান ও মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েন, এমনকি তার মানসিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। তবুও তিনি পুলিশকে জানান যে, ওই সাইকেল আরোহী তাৎক্ষণিক মারা যাননি; খুনিরা তাকে আহত অবস্থায় ফেলে রেখে কবর দেওয়ার সরঞ্জাম আনতে গিয়েছিল এবং ফিরে এসে দেখে তিনি মারা গেছেন।

এত কিছুর পরও পুলিশের ভূমিকা ছিল হতাশাজনক। তারা কি ক্যারোলিনকে সুরক্ষা দিয়েছিল? না। যখন তিনি প্রাণভয়ে নিরাপত্তার জন্য কাকুতি-মিনতি করছিলেন, তখন কি তাকে সাহায্য করা হয়েছিল? না। এমনকি দ্বিতীয়বার যখন পুলিশ স্যান্ডিকে গ্রেফতার করতে আসে, তখন একজন গোয়েন্দা ক্যারোলিনের উপস্থিতি খেয়াল না করেই চিৎকার করে ওঠেন— ‘ক্যারোলিন, তুমি তো আমাদের সাক্ষী!’ এতে তার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আচরণ। স্কটল্যান্ডের তৎকালীন হোমিসাইড প্রধান ডেভিড গ্রিন যেন এই লড়াকু নারীর প্রতি অবজ্ঞাই প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ক্যারোলিন একজন উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার হয়েও কেন সেই খুনির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন, তা তার বোধগম্য নয়। হবু খুনি স্বামীর হাত থেকে চিকিৎসক হওয়ার শপথ যে রক্ষা করতে পারে না, সেই সাধারণ জ্ঞানটুকুও হয়তো এই পুলিশ কর্মকর্তার ছিল না। আবার আসামিপক্ষের আইনজীবীর মতে, চাপের মুখে ক্যারোলিন যেভাবে ভেঙে পড়েছেন, তাতে তার প্রতি কোনো সহমর্মিতা দেখানোর সুযোগ নেই।

Advertisements

এই ডকুসিরিজটি মূলত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা একজন সাহসী নারীকেও কতটা একা করে দিতে পারে। তবে সবকিছুর শেষে একটি কথাই সত্য— ক্যারোলিন, আপনি সত্যিই অদম্য এবং অসাধারণ।

‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’ ডকুসিরিজটি এখন নেটফ্লিক্সে দেখা যাচ্ছে।

Advertisements