এআই এবং কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন

প্রতিবছর এপ্রিল মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার পালিত হয় আন্তর্জাতিক গার্লস ইন আইসিটি ডে। সে হিসাবে আজ পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ বছরের প্রতিপাদ্য– ‘উন্নয়নের জন্য এআই: মেয়েরা গড়ে তুলছে ডিজিটাল ভবিষ্যৎ’। এই প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নির্দেশনা। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হবে অর্থনীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন হবে অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা প্রায় অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৭.৭৬ শতাংশের বেশি এবং মেয়েদের অংশগ্রহণও প্রায় সমান, যা ৯৭.৮৪ শতাংশ। এই অগ্রগতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক, যা প্রায় ৩৪ শতাংশ। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে নেট ভর্তির হার প্রায় ৭০.২ শতাংশ। কিন্তু বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক বাধার কারণে অনেক মেয়ে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না।
শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও নারী-পুরুষের মধ্যে ডিজিটাল ব্যবধান এখনও বিদ্যমান। জিএসএমএ-এর মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ৮৫ শতাংশের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে আইসিটি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। বিভিন্ন শিল্প জরিপ অনুযায়ী, আইসিটি পেশাজীবীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ২০-৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তিগত ভূমিকা যেমন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় এ হার আরও কম। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্টেম শিক্ষার (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কর্মক্ষেত্রে সেই অনুপাতে প্রবেশ করছে না। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সহায়তার অভাব, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার সীমিত সুযোগ ইত্যাদি। পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশা ও পারিবারিক দায়িত্বও অনেক সময় তাদের পেশাগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বাংলাদেশেও কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি, শিক্ষায় ডিজিটাল কনটেন্ট, স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইভিত্তিক সমাধান দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। তবে গবেষণা থেকে দেখা যায়, প্রযুক্তি উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ কম হলে সেই প্রযুক্তিতে লিঙ্গপক্ষপাত (জেন্ডার বায়াস) সৃষ্টির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
উদাহরণস্বরূপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম যদি নারীদের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও আচরণগত বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত না করে, তবে তা স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান কিংবা আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে নারীরা কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, সেখানে এআইভিত্তিক সমাধানগুলোকে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে নারীদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা প্রযুক্তি নকশা ও উন্নয়নে যুক্ত হলে তা আরও বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং ব্যবহারবান্ধব সমাধান নিশ্চিত করতে পারবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং নারীর অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় এখন নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি হবে মূল চালিকাশক্তি। এই যাত্রায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুধু ন্যায়সংগতই নয়, অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।
ফাতেমা বেগম পপি: সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



