বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

গোলাপি রং মেয়েদের আর নীল ছেলেদের -কিভাবে আসলো এই রং-বিভাজন?

_d30dc53c-f38b-11e7-a734-adae4971e2ad

জেন্ডার অনুযায়ী ছেলে ও মেয়েতে নানা বিভাজন দেখা যায়। যেমন, পুতুল নিয়ে খেলবে মেয়েরা, গোলাপি জামাও পরবে তারা। তবে ছেলেরা পরবে নীল। কিন্তু গোলাপি কিংবা নীল সুদূর অতীতে নির্দিষ্ট কোনো জেন্ডারের জন্য নির্ধারিত রং ছিলই না।

উনিশ শতকের শেষদিকেও শিশুদের জেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে আলাদা রংয়ের পোষাক পরানোর চল ছিল না। সাদাকে মনে করা হতো পবিত্র রং। তাই নিষ্পাপ শিশুদের ‘নির্মল রং’ সাদা পোশাক পরানো হতো। তাছাড়া এর ভেতর ছিল বৈষয়িক চিন্তাও। শিশুরা ঘনঘন প্রস্রাব ও মলত্যাগ করে। সাদা রংয়ের পোশাকে সেটি সহজে বোঝা যায় ও কাপড় বদলে দেওয়া যায়। যদিও সাদা কাপড়ে দাগ পড়লে তা তোলা শক্ত, তবু সাদাই ছিলো জেন্ডার নির্বিশেষে শিশুদের পোশাক।

২০১১ সালে স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু: টেলিং দ্য বয়েজ ফ্রম দ্য গার্লস ইন আমেরিকা’ বইয়ের লেখিকা জো বি. পাওলেটি বলেন, ‘এটা আসলে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ পোশাক হারিয়ে যাওয়ার গল্প। আগে শিশুদের সাদা জামা পরানো হতো ব্যবহারিক কারণে। সাদা সুতি কাপড় ব্লিচ করে পরিষ্কার করা সহজ ছিল। কিন্তু পরে বাবা-মায়ের চিন্তা বদলে গেল। তারা ভাবতে শুরু করলেন, ভুল পোশাক পরালে শিশুর ব্যক্তিত্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, গোলাপি যে মেয়েদের আর নীল যে ছেলেদের- এই ধারণা একসময় ঠিক উল্টো ছিল।১৯১৮ সালের জুনে প্রকাশিত ‘ইনফ্যান্টস ডিপার্টমেন্ট’ নামের এক বাণিজ্যিক পত্রিকায় লেখা হয়, ‘জনপ্রিয় নিয়ম হলো ছেলেদের জন্য গোলাপি আর মেয়েদের জন্য নীল। কারণ গোলাপি একটি গাঢ় ও শক্তিশালী রং, যা ছেলেদের মানায়। অন্যদিকে নীল হলো নমনীয় ও শান্ত রং, যা মেয়েদের জন্য বেশি উপযুক্ত।’

এমনকি ১৯২৭ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোর তালিকাতেও দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বোস্টন, নিউ ইয়র্ক ও শিকাগোর বিখ্যাত দোকানগুলো ছেলেদের গোলাপি পোশাক পরানোর পরামর্শ দিচ্ছিল। কালার এক্সপার্ট লিয়াত্রিস আইজম্যানের মতে, ‘গোলাপি রঙের উৎস হলো লাল। লাল রং যুদ্ধ, রক্ত ও শক্তির প্রতীক। তাই হালকা হলেও গোলাপিকে ছেলেদের রং হিসেবেই দেখা হতো।’

গবেষকদের মতে, ১৯৪০-এর দশকের আগ পর্যন্ত গোলাপি ও নীলের এই বিভাজন পাকাপোক্ত হয়নি। কিছু বই ও নথিপত্রে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই রং নিয়ে বেশ বিভ্রান্তি ছিল। কখনো ছেলেদের নীল বলা হতো, আবার কখনো গোলাপি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যুদ্ধের পর যখন বেবি বুমার্স প্রজন্ম (১৯৪৬-১৯৬৪) বড় হতে শুরু করল, তখন ছেলে ও মেয়েদের পোশাকের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছেলেরা বাবার মতো আর মেয়েরা মায়ের মতো পোশাক পরা শুরু করে।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাবে ফ্যাশন জগতে বড় পরিবর্তন আসে। নারীদের মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘ইউনিসেক্স’ বা উভলিঙ্গ পোশাক জনপ্রিয়তা পায়। এই সময়ের নারীবাদীরা মনে করতেন, মেয়েদের পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই তাদের পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। তাই মেয়েদের স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতার জন্য ছেলেদের মতো প্যান্ট-শার্ট পরা শুরু হয়। ৭০-এর দশকে বিখ্যাত সিয়ার্স ক্যাটালগে টানা দুই বছর শিশুদের পোশাকে গোলাপি রঙের কোনো অস্তিত্বই ছিল না!

১৯৮৫ সালের পর আবার রং বিভাজনের পালা ফিরে আসে। এর পেছনে বড় কারণ ছিল প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ধারণ পরীক্ষা (আলট্রাসাউন্ড)। বাবা-মায়েরা যখন গর্ভাবস্থাতেই জানতে পারলেন যে ছেলে না মেয়ে হতে চলেছে, তখন তারা আগে থেকেই নির্দিষ্ট রঙের জিনিসপত্র কেনা শুরু করলেন। জো পাওলেটি বলেন, “পোশাক যত বেশি নির্দিষ্ট করা যাবে, বিক্রি তত বাড়বে।”

আগে এক শিশুসন্তানের সাদা জামা পরের সন্তানকে পরানো যেত। কিন্তু এখন প্রথম সন্তান মেয়ে হলে তার গোলাপি স্ট্রোলার বা দোলনা পরের ছেলে সন্তানকে দেওয়া বাবা-মায়েরা পছন্দ করেন না। ফলে কোম্পানিগুলোর বিক্রি বেড়ে গেল। ডায়াপার থেকে শুরু করে খেলনা- সবকিছুই গোলাপি আর নীলে ভাগ হয়ে গেল।

বর্তমানে জেন-জি (যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২-র মধ্যে) প্রজন্মের হাত ধরে ফ্যাশন আবারও বদলাচ্ছে। তারা নারী-পুরুষের ধরাবাঁধা লৈঙ্গিক পরিচয়ের বাইরে চিন্তা করতে শিখছে। তাদের কাছে পোশাকের রং দিয়ে লিঙ্গ বিচার করাটা পুরনো ধাচের। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের তরুণরা অনেক বেশি উদার।

ফ্যাশন জগৎ হয়তো শিশুদের গোলাপি আর নীলে ভাগ করে রেখেছে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় কেবল এই দুই রঙের সুতোয় বাঁধা নয়। এখন সময় এসেছে সাদা-কালো বা নীল-গোলাপির বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে রঙিন করে দেখার।

বিভাজনরঙ